নাচিছে নটনাথ, শঙ্কর মহাকাল (nachichhe notonath, shonkor mohakal)

নাচিছে নটনাথ, শঙ্কর মহাকাল।
লুটাইয়া পড়ে দিবা-রাত্রির বাঘছাল
আলো-ছায়ার বাঘ ছাল॥
ফেনাইয়া ওঠে নীল-কণ্ঠের হলাহল,
ছিঁড়ে পড়ে দামিনী অগ্নি-নাগিনী দর।
দোলে ঈশান-মেঘে ধূর্জটী-জটাজাল॥
বিষম ছন্দে বোলে ডমরু নৃত্র-বেগে,
ললাট-বহ্নি দোলে প্রলয়ানন্দে জেগে।
চরণ-আঘাত লেগে শ্মশানে কঙ্কাল॥
সে নৃত্য-ভঙ্গে গঙ্গা-তরঙ্গে
সঙ্গীত দুলে ওঠে অপরূপ রঙ্গে,
নৃত্য-উছল জলে বাজে জলদ তাল॥
সে নৃত্য-ঘোরে ধ্যান-নিমীলিত ত্রিনয়ন
প্রলয়ের মাঝে হেরে নব সৃজন-স্বপন,
জোছনা-আশিস্‌ ঝরে উছলিয়া শশী-থাল॥

  • ভাবসন্ধান: নজরুলের রচিত 'আলেয়া ' নাটকে এবং 'শ্রীশ্রীতারেকশ্বর' চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত এই গানে শিবের তাণ্ডবনৃত্যের মাধ্যমে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি, স্থিতি ও সংহারের অনন্ত চক্রকে চিত্রিত করা হয়েছে। প্রলয়ের ভয়ংকর রূপের অন্তরালেই যে নতুন জীবন, নতুন সৃষ্টি ও চিরকল্যাণের বীজ নিহিত থাকে—কবি সেই গভীর সত্যকেই শৈল্পিক ভাষায় উপস্থাপন  করেছেন। এই গানে এখানে শিব কেবল সংহারের দেবতা নন, তিনি একই সঙ্গে সৃষ্টি, ধ্বংস ও পুনর্জাগরণের প্রতীক।

    গানের শুরুতে শিবকে নটনাথ, মহাকাল এবং শঙ্কর রূপে দেখানো হয়েছে।তিনি নটনাথ, কারণ- মহাবিশ্বের সৃষ্টি, স্থিতি ও সংহারের প্রতীকী তাণ্ডবনৃত্যের অধিপতি। শিব সময়ের ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন- সৃষ্টি ও প্রলয়ের নিয়ন্তা হিসেবে তিনিই মহাকাল। প্রলয়ের মধ্য দিয়েও যিনি নবসৃষ্টির মাধ্যমে বিশ্বকল্যাণ ও  শান্তির সূচনা করেন, তাই তিনি শঙ্কর। গানের শুরুতেই শিবের নৃত্যশক্তি, প্রলয়শক্তি এবং কল্যাণশক্তি—এই তিনটি দিককে একসঙ্গে প্রকাশ করা হয়েছে।  তাঁর তাণ্ডবনৃত্যের তীব্রতায় দিন-রাত্রির প্রতীক বাঘছাল। আলো ও অন্ধকার, সময় ও প্রকৃতির সকল দ্বৈততা যেন তাঁর নৃত্যের ছন্দর প্রতীক 'বাঘছাল' লুটিয়ে পড়ে।

    গানের পরবর্তী অংশে উপস্থাপিত হয়েছে- হলাহল বিষ ধারণকারী নীলকণ্ঠী শিবকে।  যেন তাঁর কণ্ঠেধারণকৃত বিষ
    ফেনিয়ে ওঠে এবং তা বিদ্যুৎ অগ্নিনাগিনীর মতো ছিটকে  হয়ে পড়ে এবং তাঁর জটাজুটে ঈশান কোণের মেঘমালা দুলতে থাকে। প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান তাঁর মহাশক্তির প্রকাশে আন্দোলিত হয়।

    পরবর্তী অংশে তাঁর ডমরুর বিষম ছন্দ, ললাটের প্রলয়াগ্নি এবং পদাঘাতে শ্মশানের কঙ্কালের কম্পন শিবের সংহারশক্তির ভয়ংকর রূপকে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু এই সংহার ধ্বংসের জন্য নয়; এর মধ্যেই নিহিত রয়েছে নতুন সৃষ্টির সম্ভাবনা। তাই গঙ্গার তরঙ্গও তাঁর নৃত্যের সঙ্গে সুর মিলিয়ে ওঠে এবং জলরাশির উচ্ছ্বাসে যেন মেঘের তাল বেজে ওঠে। প্রকৃতি ও সঙ্গীত একাকার হয়ে মহাজাগতিক নৃত্যের অংশে পরিণত হয়।

    শেষ স্তবকে কবি গভীর দার্শনিক তাৎপর্য প্রকাশ করেছেন। ধ্যানমগ্ন ত্রিনয়ন শিব প্রলয়ের মধ্যেই নবসৃষ্টির স্বপ্ন প্রত্যক্ষ করেন। অর্থাৎ ধ্বংস কখনো চূড়ান্ত নয়; তা নতুন সৃষ্টির পূর্বপ্রস্তুতি মাত্র। শশীর থালা থেকে ঝরে পড়া জ্যোৎস্নাকে উপস্থাপন করা হয়েছে আশীর্বাদের প্রতীক হিসেবে। যা, বিশ্বজীবনকে শান্তি, কল্যাণ ও নবজাগরণের বার্তা দেয়।
  • রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। এই গানটি 'আলেয়া' গীতিনাট্যে প্রস্তাবনা'র গান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। উল্লেখ্য, কল্লোল পত্রিকার 'আষাঢ় ১৩৩৬' সংখ্যার 'সাহিত্য-সংবাদ' বিভাগে'  বিষয়ে একটি তথ্য পাওয়া যায়। তথ্যটি হলো-

'নজরুল ইসলাম একখানি অপেরা লিখেছেন। প্রথমে তার নাম দিয়েছিলেন 'মরুতৃষ্ণা'। সম্প্রতি তার নাম বদলে 'আলেয়া' নামকরণ হয়েছে। গীতি-নাট্যখানি সম্ভবত মনোমোহনে অভিনীত হবে। এতে গান আছে ত্রিশখানি। নাচে গানে অপরূপ হয়েই আশা করি এ অপেরাখানি জনসাধারণের মন হরণ করেবে।'

এই বিচারে ধারণা করা যায়, গানটি নজরুল রচনা করেছিলেন, ১৩৩৬ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসের দিকে। এই  সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩০ বৎসর ১ মাস।

  • মঞ্চস্থ নাটক: আলেয়া। ' নাট্যনিকেতন' রঙ্গমঞ্চ। ৩রা পৌষ ১৩৩৮ (শনিবার ১৯ ডিসেম্বর ১৯৩১)। প্রথম অঙ্ক। নটরাজের গান।
     
  • গ্রন্থ
    • আলেয়া
      • প্রথম সংস্করণ [ডি,এম, লাইব্রেরী। ১৩৩৮ বঙ্গাব্দ। প্রথম অঙ্ক: নটরাজের গান]
      • নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ। চতুর্থ খণ্ড [বাংলা একাডেমী, ঢাকা জ্যৈষ্ঠ ১৪১৮।  মে ২০১১। আলেয়া। প্রথম অঙ্ক: নটরাজের গান।  পৃষ্ঠা: ৩৩৯]
    • গীতি-শতদল।
      • প্রথম সংস্করণ [বৈশাখ ১৩৪১। এপ্রিল ১৯৩৪। মাড়-মিশ্র-কাওয়ালি]।
      • নজরুল রচনাবলী, পঞ্চম খণ্ড [বাংলা একাডেমী। জ্যৈষ্ঠ ১৪১৮ মে, ২০১১। গীতি-শতদল। গান সংখ্যা ৬৬। মাড়-মিশ্র-কাওয়ালি। পৃষ্ঠা ৩২০]
    • নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ২১৭০।  নাটক : ‘আলেয়া, রাগ: মাঢ় মিশ্র, তাল: কাওয়ালী। পৃষ্ঠা: ৫৯২]
       
  • পত্রিকা:
    • জয়তী [শ্রাবণ-আশ্বিন, ১৩৩৮ (আগষ্ট-সেপ্টেম্বর ১৯৩১)]
    • নাচঘর। ২ পৌষ ১৩৩৮ (শুক্রবার ১৮ ডিসেম্বর ১৯৩১)। আলেয়ার গান
    • সঙ্গীত বিজ্ঞান প্রবেশিকা [পৌষ ১৩৩৮ (ডিসেম্বর ১৯৩১-জানুয়ারি ১৯৩২)]। পৃষ্ঠা: ৫৪৫।
  • রেকর্ড:
    • ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ সেপ্টেম্বর, এইচ.এম.ভি'র সাথে নজরুলের চুক্তিপত্র অনুসারে, এই গানের পরীক্ষামূলক রেকর্ড হয়েছিল। শিল্পী ছিলেন দেবেন বিশ্বাস। পরে এই রেকর্ডটি বাতিল করা হয়েছিল।[শ্রবণ নমুনা]
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। শাক্ত। শিব। বন্দনা

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।