নূপুর মধুর রুনুঝুনু বোলে (nupur modhur runujhunu bole)
নূপুর মধুর রুনুঝুনু বোলে।
মন-গোকুলে রুনুঝুনু বোলে॥
কূলের বাঁধন টুটে,
যমুনা উথলি’ ওঠে,
পুলকে কদম ফোটে পেখম খোলে
শিখী পেখম খোলে॥
ব্রজনারী কুল ভুলে’
লুটায় সে পদমূলে
চোখে জল, বুকে প্রেম ─ তরঙ্গ দোলে॥
শ্রীমতী রাধারই সাথে
বিশ্ব ছুটেছে পথে,
হরি হরি ব’লে মাতে ত্রিভুবন ভোলে।
নামে ত্রিভুবন ভোলে॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে শ্রীকৃষ্ণের নূপুরধ্বনি, তাঁর প্রেমময় আবির্ভাব, ব্রজবাসীর নিঃস্বার্থ ভক্তি এবং রাধাকৃষ্ণের যুগলপ্রেমের সর্বজনীন মাহাত্ম্য কাব্যিক চিত্রকল্পে প্রকাশিত হয়েছে।
এই গানের শুরুতেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নূপুরধ্বনি, তাঁর প্রেমময় আগমন এবং সেই দিব্য উপস্থিতিতে সমগ্র ব্রজভূমি ও বিশ্বজগতের প্রেমোচ্ছ্বাসময় জাগরণের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। কৃষ্ণের নূপুরের মধুর রুনুঝুনু ধ্বনি কেবল বাহ্যিক শব্দ নয়; এটি ভক্তহৃদয়ে ঈশ্বরপ্রেমের জাগরণ, আনন্দ এবং চিরন্তন মিলনের আহ্বানের প্রতীক। সেই ধ্বনি মানুষের অন্তররূপী গোকুলে প্রতিধ্বনিত হয়ে হৃদয়কে প্রেম ও ভক্তিতে উদ্বেলিত করে।
কৃষ্ণের আগমনে যমুনার কূলের বাঁধন ভেঙে উথলে ওঠা, কদমফুলের প্রস্ফুটন এবং ময়ূরের পেখম মেলে নৃত্য করা—এসব চিত্রকল্পের মাধ্যমে কবি দেখিয়েছেন যে, প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান শ্রীকৃষ্ণের উপস্থিতিতে আনন্দে ও প্রেমে সাড়া দেয়। তাঁর সান্নিধ্যে জড় ও জীব—সমস্ত সৃষ্টি নবজীবন ও উল্লাসে মুখরিত হয়ে ওঠে। এরপরে
ব্রজের গোপিনীদের কৃষ্ণপ্রেমের আত্মবিস্মৃত রূপ চিত্রিত হয়েছে। তাঁরা সংসারের সকল কুল, লজ্জা ও সামাজিক বন্ধন বিস্মৃত হয়ে কৃষ্ণের চরণে আত্মসমর্পণ করেন। তাঁদের চোখে অশ্রু, বক্ষে প্রেমের উত্তাল তরঙ্গ—এই চিত্র ভক্তির সর্বোচ্চ পর্যায়, যেখানে কৃষ্ণপ্রেমের কাছে সমস্ত জাগতিক পরিচয় ও অহংকার বিলীন হয়ে যায়।
গানের শেষাংশে কবি দেখিয়েছেন যে, শ্রীমতী রাধার সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের প্রেমলীলা কেবল ব্রজভূমির ঘটনা নয়; এটি সমগ্র বিশ্বজগতের চিরন্তন প্রেমতত্ত্বের প্রতীক। রাধাকৃষ্ণের যুগলরূপের আকর্ষণে বিশ্বজগত যেন তাঁদের অনুসরণ করে চলে। তাঁদের নামস্মরণে এবং 'হরি হরি' ধ্বনিতে ত্রিভুবন আত্মহারা হয়ে যায়। এখানে রাধা ও কৃষ্ণের যুগলপ্রেম জীবাত্মা ও পরমাত্মার মিলন, ভক্ত ও ভগবানের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক এবং সর্বজনীন প্রেমের আধ্যাত্মিক সত্যকে প্রকাশ করেছে।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ অক্টোবর (রবিবার ২৭ আশ্বিন ১৩৩৯) প্রকাশিত 'বনগীতি' গ্রন্থে গানটি প্রথম অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৩ বৎসর ৪ মাস।
- গ্রন্থ:
- বনগীতি।
- প্রথম সংস্করণ [১৩ অক্টোবর ১৩৩২ (রবিবার ২৭ আশ্বিন ১৩৩৯)]। খাম্বাজ-কাওয়ালী। পৃষ্ঠা: ৮৮
- নজরুল রচনাবলী। জন্মশতবর্ষ সংস্করণ পঞ্চম খণ্ড। বাংলা একাডেমী। ঢাকা। জ্যৈষ্ঠ ১৪১৮ মে, ২০১১ । বনগীতি। গান সংখ্যা ৫৮। খাম্বাজ-কাওয়ালী। পৃষ্ঠা ২১২-১৩]
- বনগীতি।
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ২৪৯।
- রেকর্ড: টুইন [অক্টোবর ১৯৩২ (আশ্বিন-কার্তিক ১৩৩৯)]। এন ২২২৯। শিল্পী: জ্ঞানেন্দ্রনাথ ঘোষ[শ্রবণ নমুনা]
- স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি: সুধীন দাশ ও ব্রহ্মমোহন ঠাকুর [নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি, অষ্টম খণ্ড নজরুল ইন্সটিটিউট ১২ ভাদ্র, ১৩৯৯ বঙ্গাব্দ/ ২৭ আগষ্ট, ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দ। ১৫ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা: ৭৬-৭৮] [নমুনা]
- সুরকার: কাজী নজরুল ইসলাম
- পর্যায়: