পথে পথে কে বাজিয়ে চলে বাঁশি (pothe pothe ke bajiye chole bashi)

পথে পথে কে বাজিয়ে চলে বাঁশি
হল বিশ্ব-রাধা ঐ সুরে উদাসী॥
শুনে ঐ রাখালের বেণু
আসে ছুটে আলোক-ধেনু,
ঐ নীল গগনে রাঙা মেঘে ওড়ে গো-খুর রেণু,
ওসে শ্যাম-পিয়ারী গোপ–ঝিয়ারি গ্রহ তারার রাশি॥
                সেই বাঁশির অন্বেষণে
                যত মন-বধু যায় বনে,
তাদের প্রেম যমুনায় বান ডেকে যায় কুল খোয়ায় গোপনে।
তারা রাস দেউলে রসের বাউল আনন্দ-ব্রজবাসী।

  • ভাবসন্ধান: এই গানে কবি শ্রীকৃষ্ণের বাঁশির অলৌকিক আকর্ষণ, বিশ্বময় প্রেমজাগরণ এবং আত্মার পরমাত্মার প্রতি আকুল টানের চিত্র অঙ্কন করেছেন। এখানে বাঁশি কেবল একটি বাদ্যযন্ত্র নয়; এটি ঈশ্বরের প্রেমময় আহ্বানের প্রতীক, যা সমগ্র সৃষ্টি ও মানবহৃদয়কে নিজের দিকে টেনে নেয়।

    গানের শুরুতেই কবি প্রশ্ন করেছেন—'পথে পথে কে বাজিয়ে চলে বাঁশি?' সেই বাঁশির সুরে সমগ্র বিশ্ব যেন রাধার মতো উদাস ও প্রেমমগ্ন হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ, কৃষ্ণের প্রেমময় আহ্বানে সমস্ত সৃষ্টি পরম সৌন্দর্যের দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে। রাখাল-কৃষ্ণের বেণুর ধ্বনি শুনে 'আলোক-ধেনু' ছুটে আসে—এখানে আলো ও ধেনুর চিত্রকল্পে বোঝানো হয়েছে যে, প্রকৃতি, প্রাণ ও চেতনার সব শক্তিই তাঁর দিকে ধাবিত হয়। নীল আকাশে রাঙা মেঘ যেন গো-খুরের ধুলো হয়ে উড়ে বেড়ায়। সমগ্র মহাবিশ্ব কৃষ্ণের লীলাক্ষেত্রে রূপান্তরিত হয়। গ্রহ-নক্ষত্রগুলোকেও কবি শ্যাম-পিয়ারীর গোপঝিয়ারিরূপে কল্পনা করেছেন, অর্থাৎ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি সত্তা কৃষ্ণপ্রেমের নৃত্যে অংশগ্রহণ করছে।

    গানের পরবর্তী অংশে বলা হয়েছে- সেই বাঁশির সন্ধানে অসংখ্য 'মন-বধূ' বনপথে ছুটে যায়। এখানে মন-বধূ বলতে মানবাত্মাকে বোঝানো হয়েছে, যে পরমাত্মার সন্ধানে ব্যাকুল। তাঁদের প্রেম-যমুনায় এমন বন্যা আসে যে, জাগতিক কূল-মান, লজ্জা ও সীমাবদ্ধতা গোপনে ভেসে যায়। অর্থাৎ, ঈশ্বরপ্রেম মানুষের অহংকার ও সংসারবন্ধন ভেঙে দেয়। শেষে কবি দেখিয়েছেন, এই প্রেমযাত্রার পরিণতি হলো 'রাস দেউল'—অর্থাৎ প্রেমের মহামিলনের ক্ষেত্র। সেখানে সবাই 'রসের বাউল', আনন্দময় ব্রজবাসী; অর্থাৎ তারা আর জাগতিক পরিচয়ে আবদ্ধ নয়, বরং কৃষ্ণপ্রেমের আনন্দে আত্মহারা।

     
  • রচনাকাল ও স্থান:  গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।  ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই (আষাঢ়-শ্রাবণ ১৩৩৯) মাসে গানটি এইএইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি থেকে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৩ বৎসর ১ মাস।
     
  • গ্রন্থ:
    • বনগীতি
      • প্রথম সংস্করণ [১৩ অক্টোবর ১৩৩২ (রবিবার ২৭ আশ্বিন ১৩৩৯)]। বাউল-কার্ফা। পৃষ্ঠা: ৮৩]
      • নজরুল রচনাবলী। জন্মশতবর্ষ সংস্করণ পঞ্চম খণ্ড। বাংলা একাডেমী। ঢাকা। জ্যৈষ্ঠ ১৪১৮ মে, ২০১১ । বনগীতি। ৫৫ সংখ্যক গান।  বাউল-কার্ফা। পৃষ্ঠা ২১০-২১১]
    • নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ১৯৮৭। তাল: কাহারবা। পৃষ্ঠা: ৫৯৭।]
       
  • রেকর্ড: এইচএমভি [জুলাই ১৯৩২ (আষাঢ়-শ্রাবণ ১৩৩৯)। এন ৭০০৬। শিল্পী: আশ্চর্যময়ী দাস। 
  • রেকর্ড: এইচএমভি [জুলাই ১৯৩২ (আষাঢ়-শ্রাবণ ১৩৩৯)। এন ৭০০৬। শিল্পী: আশ্চর্যময়ী দাস। 
  • স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ:  ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। কৃষ্ণ। বন্দনা
    • সুরাঙ্গ: বাউলাঙ্গ
    • তাল: কাহারবা
    • গ্রহস্বর: সা

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।