বক্ষে আমার কা'বার ছবি চক্ষে মোহাম্মদ রসুল (bokhhe amar ka'bar chhobi)

বক্ষে আমার কা'বার ছবি চক্ষে মোহাম্মদ রসুল।
শিরোপরি মোর খোদার আরশ গাই তাঁরি গান পথ বেভুল॥
লায়লী প্রেমে মজনু পাগল আমি পাগল লা-ইলা'র,
প্রেমিক দরবেশ আমায় চেনে অরসিকে কয় বাতুল॥
হৃদয় মোর খুশির বাগান বুলবুলি তায় গায় সদাই,
ওরা খোদার রহম মাগে আমি খোদার ইশ্‌ক্ চাই।
আমার মনের মস্‌জিদে দেয় আজান হাজার মোয়াজ্জিন
প্রাণের 'লওহে' কোরান লেখা রুহ্ পড়ে তা রাত্রি দিন।
খাতুনে জিন্নত মা আমার হাসান হোসেন চোখের জল,
ভয় করি না রোজ-কেয়ামত পুল সিরাতের কঠিন পুল॥

  • ভাবসন্ধান: এই গানে ইসলামী আধ্যাত্মিকতা, সুফি প্রেমতত্ত্ব এবং মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি গভীর ভক্তি এক অপূর্ব কাব্যিক রূপে প্রকাশিত হয়েছে। কবি এখানে বাহ্যিক ধর্মাচরণের চেয়ে অন্তরের ঈমান, আল্লাহপ্রেম এবং রাসুলপ্রেমকেই জীবনের সর্বোচ্চ সাধনা হিসেবে তুলে ধরেছেন। প্রতিটি চিত্রকল্পে আত্মার সঙ্গে পরমসত্তার মিলনের আকাঙ্ক্ষা এবং আধ্যাত্মিক উন্মেষের ব্যঞ্জনা নিহিত রয়েছে।

    গানের শুরুতেই কবি বলেন, তাঁর বক্ষে যেন পবিত্র কাবা শরিফের প্রতিচ্ছবি এবং চোখে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র রূপ সদা বিরাজমান। তাঁর মস্তকের ওপর সর্বদা আল্লাহর আরশের মহিমা বিরাজ করছে। তাই তিনি জগতের সকল মোহ ভুলে সর্বক্ষণ আল্লাহরই গুণগান করেন। এখানে কাবা, রাসুল এবং আরশ মানুষের হৃদয়ে ঈমান, নবীপ্রেম ও আল্লাহর সর্বোচ্চ কর্তৃত্বের প্রতীক।

    গানটির পরবর্তী অংশে কবি সুফি প্রেমতত্ত্বের আশ্রয় নিয়ে বলেন, যেমন মজনু লাইলার প্রেমে আত্মহারা হয়েছিলেন, তেমনি তিনিও আল্লাহর প্রেমে উন্মত্ত। এখানে 'লা-ইলা' শব্দটি দ্ব্যর্থবোধক। একদিকে তা লায়লার নামের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, অন্যদিকে ইসলামের মৌলিক কালিমা 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'-এর সূচনাংশের প্রতিধ্বনি বহন করে। অর্থাৎ কবির প্রেম কোনো পার্থিব প্রেম নয়; এটি একান্তই আল্লাহপ্রেম। তাই প্রকৃত প্রেমিক ও দরবেশেরা তাঁকে চিনতে পারেন, কিন্তু যারা এই আধ্যাত্মিক প্রেমের স্বাদ পায়নি, তারা তাঁকে উন্মাদ বা বাতুল বলে মনে করে।

    এরপর কবি তাঁর হৃদয়কে আনন্দের এক প্রস্ফুটিত উদ্যানের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যেখানে বুলবুলির গান অবিরাম ধ্বনিত হচ্ছে। সাধারণ মানুষ আল্লাহর কাছে তাঁর রহমত বা অনুগ্রহ প্রার্থনা করে; কিন্তু কবি শুধু রহমত নন, আল্লাহর ইশ্‌ক বা নিখাদ প্রেম কামনা করেন। সুফি দর্শনে আল্লাহর প্রেমই সর্বোচ্চ প্রাপ্তি; কারণ সেই প্রেম মানুষকে পরমসত্তার নৈকট্যে পৌঁছে দেয়।

    গানের পরবর্তী অংশে কবি বলেন, তাঁর অন্তরই যেন এক মসজিদ, যেখানে অসংখ্য মুয়াজ্জিন নিরন্তর আজান দিচ্ছেন। তাঁর প্রাণের লওহে (ফলক বা পটে) পবিত্র কোরআনের বাণী লেখা আছে এবং তাঁর রুহ বা আত্মা দিন-রাত সেই বাণী পাঠ করছে। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, সত্যিকার ঈমান মানুষের বাহ্যিক আচারে নয়, বরং অন্তরের গভীরে প্রতিষ্ঠিত থাকে। যখন হৃদয় আল্লাহর স্মরণে পরিপূর্ণ হয়, তখন সমগ্র জীবনই ইবাদতে পরিণত হয়।

    গানের শেষাংশে কবি ইসলামের পবিত্র ব্যক্তিত্বদের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন। জান্নাতের নারীদের নেত্রী হযরত ফাতিমা (রা.) তাঁর কাছে মাতৃসম, আর ইমাম হাসান (রা.) ও ইমাম হোসাইন (রা.) তাঁর হৃদয়ের অমূল্য ধন। এই ভালোবাসা ও আল্লাহর প্রেমে পরিপূর্ণ ঈমানের কারণেই তিনি কিয়ামতের দিন কিংবা পুলসিরাতের কঠিন পরীক্ষাকেও ভয় করেন না। তাঁর বিশ্বাস, আল্লাহর প্রেম ও রাসুলের অনুসরণই তাঁকে মুক্তির পথে পরিচালিত করবে।

     
  • রচনাকাল: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর (আশ্বিন ১৩৩৮ বঙ্গাব্দ) মাসে প্রকাশিত 'চন্দ্রবিন্দু' সঙ্গীত-সংকলনে গানটি প্রথম অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুল ইসলামের বয়স ছিল ৩২ বৎসর ৪ মাস।
     
  • গ্রন্থ:
    • চন্দ্রবিন্দু
      • প্রথম সংস্করণ [সেপ্টেম্বর ১৯৩১, আশ্বিন ১৩৩৮ বঙ্গাব্দ।]
      • নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ, চতুর্থ খণ্ড [জ্যৈষ্ঠ ১৪১৮, মে ২০১১। চন্দ্রবিন্দু। ৪৩। বাগেশ্রী-সিন্ধু-কাহারবা। পৃষ্ঠা: ১৮৪]
    • জুলফিকার
      • প্রথম সংস্করণ। ১৫ অক্টোবর ১৯৩২ (শনিবার ২৯ আশ্বিন ১৩৩৯)। সিন্ধু-বাগেশ্রী-কার্ফা]
      • নজরুল রচনাবলী,  জন্মশতবর্ষ সংস্করণ। চতুর্থ খণ্ড। বাংলা একাডেমী, ঢাকা।  জ্যৈষ্ঠ ১৪১৪, মে ২০০৭। ১৪ সংখ্যক গান। সিন্ধু-বাগেশ্রী-কার্ফা। পৃষ্ঠা: ২৯৯-৩০০]
    • নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, [নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২। ৫৮৯ সংখ্যক গান। তাল: কাহারবা। পৃষ্ঠা: ১৭৯-১৮০]
  • রেকর্ড: এইচএমভি। জুন ১৯৩২ (জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় ১৩৩৯)। এন ৭০০৫। শিল্পী: মোহাম্মদ কাসেম। [শ্রবন নমুনা]
  • স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি:
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলামী গান। সুফি। মিলনাকাঙ্ক্ষা
    • সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের গান

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।