ভুখা আঁখি কাজ কি ঢাকি ওড়না দিয়ে গুলবদন্‌ (bhukha akhi kaaj ki dhaki)

ভুখা আঁখি কাজ কি ঢাকি ওড়না দিয়ে গুলবদন্‌
পিয়েই না হয় নিলে ও রূপ আঁখির ক্ষুধা আর্ত মন॥
‘হারুত’ সম সই হামেশা আশেক হওয়ার হয়রানি।
হায়, যদি না দেখত কভু ও রূপ আমার দুই নয়ন॥
‘হারুত’ কি হায় বন্দী হত চিবুক টোলের রস-কুঁয়ায়
‘মারুত’ যদি না কইত গো সেই রূপসীর রূপ কেমন॥
আমার মতন ও রূপ দেখে ভুল বকে কি বুলবুলি?
তোমার মুখের খোশ্‌বু লেগে ফুলের বাসে মাত্‌ল বন॥
তোমায় ভালবেসে সখি দুঃখ ব্যথার অন্ত নাই।
ঘোমটা খোলো, হাফিজ তোমার রূপ দেখে নিক মনোমোহন।

  • ভাবসন্ধান: এই গানে কবি পারশ্যের প্রেমকাব্যের রীতি অনুসরণ করে রূপের মোহ, প্রেমের আকুলতা এবং প্রিয়ার সৌন্দর্যে প্রেমিকের আত্মবিস্মৃত অবস্থার চিত্র এঁকেছেন। এখানে প্রেমিক তাঁর প্রিয়তমার প্রতি গভীর অনুরাগ ও সৌন্দর্যপিপাসা প্রকাশ করেছেন।

    একই সঙ্গে ইসলামী ও পারস্য সাহিত্যের বিখ্যাত প্রতীক হারুত ও মারুত-এর উপমা ব্যবহার করে প্রিয়ার সৌন্দর্যের অতুলনীয় প্রভাব বর্ণনা করেছেন। গানের শুরুতেই প্রেমিক বলেন, 'ভুখা আঁখি কাজ কি ঢাকি ওড়না দিয়ে গুলবদন।' অর্থাৎ, তাঁর সৌন্দর্যপিপাসু চোখের কাছে ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকে কোনো লাভ নেই। 'গুলবদন' অর্থ গোলাপের মতো কোমল ও সুন্দর দেহবিশিষ্টা। প্রেমিকের চোখ সেই রূপের দর্শনে তৃপ্তি পেতে চায়। তাই তিনি বলেন, একবার সেই রূপ দেখে নিলেই তাঁর চোখের ক্ষুধা ও হৃদয়ের আকুলতা কিছুটা প্রশমিত হবে।

    গানের পরবর্তী অংশে কবি হারুত-এর প্রসঙ্গ এনেছেন। ইসলামী কাহিনি অনুসারে, হারুত ও মারুত ছিলেন দুই ফেরেশতা, যারা এক অপরূপ সুন্দরীর মোহে পরীক্ষার সম্মুখীন হয়ে বিপদে পড়েছিলেন। কবি বলেন, যদি হারুত এই রূপ না দেখতেন, তবে প্রেমে পড়ার এমন দুর্দশায় পড়তেন না। অর্থাৎ প্রিয়ার সৌন্দর্য এতই প্রবল যে, তা স্বর্গীয় সত্তাকেও মুগ্ধ ও বিপর্যস্ত করতে পারে। এরপর তিনি বলেন, হারুত কি সেই চিবুকের টোলের রসকূপে বন্দী হতেন, যদি মারুত তাঁকে এই রূপের কথা না বলতেন? এখানে চিবুকের টোলকে 'রস-কূপ' বলা হয়েছে- এ এক অপূর্ব কাব্যিক রূপক। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে, প্রিয়ার সামান্য একটি হাসি বা টোলও প্রেমিককে সম্পূর্ণভাবে আবিষ্ট করে ফেলে। পরবর্তী স্তবকে প্রেমিক নিজের অবস্থার সঙ্গে বুলবুলি পাখির তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, যেমন গোলাপের সৌন্দর্য ও সৌরভে বুলবুলি গান গেয়ে আত্মহারা হয়ে যায়, তেমনি তিনিও প্রিয়ার রূপ দেখে সংযম হারিয়ে ফেলেছেন। তাঁর মুখের খোশবু (সুবাস) এমনই মোহনীয় যে, তার স্পর্শে সমগ্র ফুলের বাগান মাতাল হয়ে ওঠে। এখানে প্রিয়ার সৌন্দর্যকে প্রকৃতির সৌন্দর্যেরও ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া হয়েছে।

    গানের শেষাংশ স্তবকে প্রেমিক স্বীকার করেন, এই প্রেম তাঁকে সীমাহীন দুঃখ ও ব্যথা দিয়েছে, তবু সেই প্রেম থেকে তিনি সরে আসতে চান না। বরং তিনি প্রিয়াকে অনুরোধ করেন, ঘোমটা সরিয়ে মুখখানি দেখাতে। 'হাফিজ' শব্দটি এখানে পারস্যের মহাকবি হাফিজ শিরাজির স্মরণও বহন করে; অর্থাৎ কবি যেন পারস্য প্রেমকাব্যের ঐতিহ্য অনুসরণ করে বলছেন—প্রিয়ার সৌন্দর্য একবার দর্শন করেই প্রেমিকের মন পরিপূর্ণ হোক। অতএব, এই গানে নজরুল মানবপ্রেম, রূপমুগ্ধতা, পারস্য কাব্যের প্রতীক, ইসলামী উপাখ্যান এবং প্রকৃতির রূপক একত্রিত করে প্রেমিকের হৃদয়ের গভীর আকুলতা প্রকাশ করেছেন।

     
  • রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। কল্লোল পত্রিকার 'ভাদ্র ১৩৩৪' সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।  এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ২৮ বৎসর ৪ মাস।
     
  • পত্রিকা: কল্লোল। ভাদ্র ১৩৩৪ (আগষ্ট-সেপ্টেম্বর ১৯২৭) সংখ্যা। গান।
  • গ্রন্থ: নজরুল রচনাবলী ১১শ খণ্ড (১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৭, ২৫ মে ২০১০)। অগ্রন্থিত গান। গজল ২৭৩। পৃষ্ঠা: ১৪৪।
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: প্রেম

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।