বন্দীর মন্দিরে জাগো দেবতা! (bondir mondire jago debota)
বন্দীর মন্দিরে জাগো দেবতা!
আনো অভয়ঙ্কর শুভ-বারতা।
জাগো দেবতা, জাগো দেবতা॥
শৃঙ্খলে বাজে তব সম্বোধনী,
কারায় কারায় জাগে তব শরণি,
বিশ্বমুক ভীত, কহ গো কথা!
জাগো দেবতা, জাগো দেবতা॥
নিশিদিন শোনে নিপীড়িতা ধরণী
অশ্রুতে অ-শ্রুত শঙ্খধ্বনি!
পঙ্গু রুগ্ন নর অত্যাচারে,
ধর্ষিতা নারী কাঁদে দৈত্যাগারে,
জাগো পাষাণ, ভাঙো নীরবতা।
জাগো দেবতা, জাগো দেবতা॥
- ভাবার্থ: এই গানে কবি অন্যায়, অত্যাচার, শোষণ ও মানবতার বিপর্যয়ের মুখে ন্যায়, সত্য ও মুক্তির শক্তির প্রতি এক তীব্র আহ্বান জানিয়েছেন। এখানে ‘দেবতা’ কোনো নির্দিষ্ট দেব-দেবীর প্রতীক নয়; বরং ন্যায়, মানবতা, বিবেক, মুক্তি ও চিরকল্যাণের প্রতীক। মানবসভ্যতা যখন অত্যাচার, অবিচার ও ভয়ের অন্ধকারে নিমজ্জিত, তখন কবি সেই সুপ্ত ন্যায়শক্তিকে জাগ্রত হওয়ার জন্য আকুল প্রার্থনা করেছেন।
গানের শুরুতেই কবি বন্দিশালাকেই দেবতার মন্দির বলে অভিহিত করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, সত্য, ন্যায় ও স্বাধীনতার জন্য যারা বন্দি হয়েছে, তাদের কারাগারই প্রকৃতপক্ষে পবিত্র তীর্থক্ষেত্র। তাই তিনি দেবতার কাছে আহ্বান জানিয়েছেন—তিনি যেন জেগে উঠে নির্যাতিত মানুষের জন্য অভয়, মুক্তি ও আশার বাণী নিয়ে আসেন। এখানে ‘অভয়ঙ্কর শুভবার্তা’ বলতে অন্যায়ের অবসান এবং সত্য ও ন্যায়ের বিজয়ের প্রত্যাশাকেই বোঝানো হয়েছে।
গানটির পরবর্তী অংশে কবি বলেন, বন্দিদের শৃঙ্খলের ঝনঝন ধ্বনিই যেন দেবতার উদ্দেশে নিবেদিত আহ্বানধ্বনিতে পরিণত হয়েছে। প্রতিটি কারাগারে, প্রতিটি নির্যাতিত মানুষের আর্তনাদে দেবতার শরণাগতির আবেদন ধ্বনিত হচ্ছে। সমগ্র বিশ্ব আজ ভীত, স্তব্ধ ও নির্বাক; তাই কবি দেবতার কাছে অনুরোধ করেন, তিনি যেন নীরব না থেকে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে তাঁর বাণী উচ্চারণ করেন।
এরপর কবি পৃথিবীর অসহায় মানুষের দুর্দশার করুণ চিত্র তুলে ধরেছেন। দিনরাত নির্যাতিত পৃথিবী মানুষের অশ্রুর মধ্য দিয়ে এমন এক শঙ্খধ্বনি শুনছে, যা মুখে উচ্চারিত না হলেও প্রতিবাদ, বেদনা ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় অনুরণিত। এখানে ‘অশ্রুতে অ-শ্রুত শঙ্খধ্বনি’ একটি গভীর রূপক; এটি নিপীড়িত মানুষের নীরব আর্তনাদ, যা উচ্চারিত না হলেও সমগ্র মানবতার বিবেককে আলোড়িত করে।
গানটি শেষাংশে কবি সমাজের চরম অবক্ষয়ের চিত্র তুলে ধরেছেন। অত্যাচারে পীড়িত অসহায় মানুষ, শক্তিহীন ও রোগাক্রান্ত জনগণ এবং দৈত্যসম অত্যাচারীদের হাতে লাঞ্ছিত নারী—এসব দৃশ্য মানবসভ্যতার গভীর সংকটের প্রতীক। এই ভয়াবহ অবস্থায় কবি ‘পাষাণ’ দেবতার নীরবতা ভেঙে জেগে ওঠার আহ্বান জানান। অর্থাৎ তিনি চান, ন্যায় ও মানবতার শক্তি আর নিষ্ক্রিয় না থেকে অত্যাচারের বিরুদ্ধে সক্রিয় হোক এবং পৃথিবীতে ন্যায়, শান্তি ও মানবমর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করুক।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায় না। ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দের ২৪শে ডিসেম্বর (বুধবার ৯ পৌষ ১৩৩৭), মন্মথ রায় রচিত 'কারাগার' নাটকটি মঞ্চস্থ হয়েছিল 'মনোমোহন থিয়েটারে। এই নাটকে গানটি ব্যবহৃত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩১ বৎসর ৬ মাস।
- মঞ্চ:
- কারাগার। নাট্যকার মন্মথ রায়।
- ২৪ ডিসেম্বর ১৩৩০ (বুধবার ৯ পৌষ ১৩৩৭)। তৃতীয় অঙ্ক। দৃশ্য দুই। 'ধরিত্রী'র গান। শিল্পী: নীহারবালা। মনোমোহন থিয়েটার-এ মঞ্চস্থ হয়েছিল।
- ৮ আগষ্ট ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দ (শনিবার ২৩ শ্রাবণ ১৩৩৮) নাট্যনিকেতনে মঞ্চস্থ হয়েছিল।
- কারাগার। নাট্যকার মন্মথ রায়।
- গ্রন্থ:
- কারাগার। মন্মথ রায় নাট্যগ্রন্থাবলী দ্বিতীয় খণ্ড [জগদ্ধাত্রী পূজা ১৩৫৮। ২৫শে নভেম্বর ১৯৫১। তৃতীয় অঙ্ক। দৃশ্য দুই। 'ধরিত্রী'র গান]
- চন্দ্রবিন্দু
- প্রথম সংস্করণ [সেপ্টেম্বর ১৯৩১, আশ্বিন ১৩৩৮ বঙ্গাব্দ।]
- নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ, চতুর্থ খণ্ড [জ্যৈষ্ঠ ১৪১৮, মে ২০১১। চন্দ্রবিন্দু। ১১। হাম্বীর-কাওয়ালি পৃষ্ঠা: ১৬৯]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ২০১৮]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। সাধারণ। দৈবসত্তা। প্রার্থনা