আমি কূল ছেড়ে চলিলাম ভেসে বলিস্ ননদীরে সই, বলিস্ ননদীরে। (ami kul chhere cholilam bheshe)

আমি    কূল ছেড়ে চলিলাম ভেসে বলিস্ ননদীরে সই, বলিস্ ননদীরে।
          শ্রীকৃষ্ণ নামের তরণীতে প্রেম-যমুনার তীরে বলিস্ ননদীরে
                                                            সই, বলিস্ ননদীরে॥
          সংসারে মোর মন ছিল না, তবু মানের দায়ে
আমি
    ঘর করেছি সংসারেরি শিকল বেঁধে পায়ে
          শিক্‌লি-কাটা পাখি কি আর পিঞ্জরে সই ফিরে॥
          বলিস্ গিয়ে কৃষ্ণ নামের কলসি বেঁধে গলে
          ডুবেছে রাই কলঙ্কিনী কালিদহের জলে।
          কলঙ্কেরই পাল তুলে সই, চল্‌লেম অকূল-পানে
          নদী কি সই, থাকতে পারে সাগর যখন টানে।
          রেখে গেলাম এই গোকুলে কুলের বৌ-ঝিরে॥

  • ভাবসন্ধান: রূপকল্প ও সান্ধ্য ভাষায় কৃষ্ণ-প্রেমে অধীর রাধার অভিসারকে ব্যক্ত করা হয়েছে এই গানে। তাঁর এই অভিসারের প্রধান অন্তরায় তাঁর ননদিনী। অভিসারে যাওয়ার পথে তাঁর সখিদের ডেকে তিনি- ননদিনীকে জানাতে বলেছেন- তাঁর অভিসারের কথা। রাধাকৃষ্ণের পালায় রাধা কৃষ্ণের সাথে পালিয়ে নিরুদ্দেশ হয়েছিলেন- এমনটা জানা যায় না। তাই এই গানের প্রেম-যমুনা, শ্রীনামের তরী, কৃষ্ণ নামের কলস, কালীদহ, নদী, সাগর সবই ব্যবহৃত হয়েছে রূপাকার্থে। আর তাঁর সংসার ত্যাগ করে রাধার চলে যাওয়াটা কৃষ্ণাভিসার।

    এ গানের যমুনা- রাধাকৃষ্ণের প্রেম-প্রবাহ। সে নদীতে রাধার তরণী কৃষ্ণ। সংসারের সকল বাধা-নিষেধ উপেক্ষা করে অভিসারিণী রাধা চলেছেন প্রেম-যমুনার তীরে।

    তাঁর সংসারে মন কোনো দিনই ছিল না। তাই তাঁর কাছে সংসারের বন্ধন ছিল পায়ে বাধা শিকলের মতো। শিকল কাটা মুক্ত পাখি যেমন আবার খাঁচায় ফিরে আসে না, তেমনি রাধাও আবার সংসার কারাগরে ফিরে আসতে চান না। তাই সখিদের কাছে বলছেন- তাঁর ননদিনীকে যেন তাঁর বলেন- রাই ডুবেছে কৃষ্ণনামের কলসি গলায় বেঁধে কালীদহে।  এখানে কৃষ্ণ-নামের কলস তাঁর সংসারের মৃত্যরূপ বন্ধন থেকে মুক্তির অবলম্বন। কালীদহ কলঙ্গের বিষধর সর্পের আশ্রয়স্থল। কৃষ্ণনামের কলস গলায় বেঁধে কালীদহে ঝাঁপয়ে পড়ার মধ্যে রয়েছে- কলঙ্ককে বরণ করেই কৃষ্ণের কাছে সমর্পণ।  সেখানেই তাঁর প্রেমের মুক্তি। সেই কলঙ্কের পাল তুলে তিনি কৃষ্ণনামের তরীতে চলেছেন, সংসারের কুল ছেড়ে প্রেমের অকূল সাগরে।

    নদী-রূপিণী রাধা চলেছেন সাগর-রূপী কৃষ্ণের কাছে। সে নদী কি সাগরের টানকে অগ্রাহ্য কতে পারেন? পারেন না বলেই, কূলের বৌ-ঝিদের জানান দিয়ে অভিসারণী রাধা চলেছেন কৃষ্ণাভিসারে।

     
  • রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে জানা যায় না। ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর (আশ্বিন-কার্তিক ১৩৪৯) মাসে এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। সেই সময় নজরুল ইসলামের বয়স ছিল ৩৮ বৎসর।
     
  • রেকর্ড: এইচএমভি [অক্টোবর ১৯৪২ (আশ্বিন-কার্তিক ১৩৪৯) । রেকর্ড নম্বর এন ৯৯৬৩। শিল্পী: মৃণালকান্তি ঘোষ। সুর:  গিরীন চক্রবর্তী। [শ্রবণ নমুনা]
     
  • স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার: সুধীন দাশ ও ব্রহ্মমোহন ঠাকুর। [নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি, একাদশ খণ্ড (নজরুল ইনস্টিটিউট জুন ১৯৯৭)] দ্বিতীয় গান [নমুনা]
     
  • সুরকার: গিরীন চক্রবর্তী।
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। রাধা-কৃষ্ণ-লীলা। অভিসার
    • সুরাঙ্গ: ভাটিয়ালি


 

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।