আমি কৃষ্ণচূড়া হতাম যদি হতাম ময়ূর-পাখা, (সখা হে) (ami krishnochura hotam jodi hotam)
আমি কৃষ্ণচূড়া হতাম যদি হতাম ময়ূর-পাখা, (সখা হে)!
তোমার বাঁকা চূড়ায় শোভা পেতাম ওগো শ্যামল বাঁকা॥
আমি হলে গোপীচন্দন, শ্যাম, অলকা-তিলকা হতাম;
শ্যাম, ও-চাঁদমুখে অলকা-তিলকা হতাম।
শ্রীঅঙ্গের পরশ পেতাম হ’লে কদম-শাখা॥
আমি বৃন্দাবনে বন-কুসুম হতাম যদি কালা,
কণ্ঠ ধ’রে ঝ’রে যেতাম হয়ে বনমালা।
আমি নূপুর যদি হতাম হরি
কাঁদতাম শ্রীচরণ ধরি’
ব্রজবুলি হলে রইত বুকে চরণ-চিহ্ন আঁকা॥
- ভাবসন্ধান: কোন এক কৃষ্ণ-অনুরাগিণীর কৃষ্ণ-সঙ্গের কামনা এই গানে ফুটে উঠেছে নানা রূপকল্পের চিত্ররূপ হয়ে। এই অনুরাগিণী কৃষ্ণের অনুষঙ্গী হতে চান অঙ্গরাগে, নানা সৌন্দর্য উপকরণে।
এই গানের অনুরাগিণীর কামনা- যদি তিনি কৃষ্ণচূড়া বা ময়ূরের পাখা হতে পারতেন, তা হলে- তিনি কৃষ্ণের মুকুটে শোভা পাওয়ার সৌভাগ্য লাভ করতেন। তিনি যদি গোপী- চন্দন (বৈষ্ণবদের ব্যবহৃত তিলকমাটি) হতেন, তা হলে তিনি হতে পারতেন কৃষ্ণের অলকা-তিলকা (মুখের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য চুলে চুর্ণকুন্তল এবং মুখে চন্দন দিয়ে অঙ্কিত চিত্র )। তিনি যদি কদম শাখা হতেন, তাহলে তিনি শ্রীকৃষ্ণের অঙ্গ-পরশ পেতেন। আর যদি বৃন্দাবনের বনকুসুম হতেন, তবে তাঁর কণ্ঠের বনমালা হয়ে নিজেকে নিঃশেষ করে ঝরে পরতে পারতেন। যদি নূপর হতে পারতেন তিনি, তাহলে শ্রীকৃষ্ণের চরণ জড়িয়ে ধরে, তাঁর করুণা লাভের আশায় কাঁদনে। ব্রজ-পদাবলির চরণ-চিহ্নে (এখানে কবিতার চরণ বা পঙক্তিতে উদ্ধৃতিতে) বাণীচিত্র হয়ে বিরাজ করতো তাঁর ক্রন্দনধ্বনি।
এ গানের সকল কামনাই 'হতাম যদি' অনুজ্ঞায় অনিশ্চিত এবং যা কল্পনাশ্রয়ী। যা বাস্তবতার বিচারে অলীক। যা হবার নয়, তাই যেন হয়, আর যদি হয়- তা শুধু কৃষ্ণের জন্যই। অনুরাগিণীর এই কামনা কল্পলোকের বিহারে অলৌকিক ভাবনাকে অবাস্তবতার দিকে ঠেলে দেয় বটে, কিন্ত শাশ্বত প্রেমের কামনায় তা হয়ে ওঠে সত্যকাম। অনুরাগিণীর এই ভাবনা নিতান্তই নিজের। কিন্তু কার কাছে তাঁর এই 'হতাম যদি' নিবেদন করছেন। এ কোনো বিশেষ অদৃষ্টশক্তির কাছে নয়। এ কামনা একমাত্র কৃষ্ণকে পাওয়ার জন্য কৃষ্ণের কাছেই। তাই এই কামনা হয়ে উঠেছে কৃষ্ণের অনুরাগিণীর প্রার্থনা স্বরূপ।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় না।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২)। ১০৯৯ সংখ্যক গান।
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণবসঙ্গীত। কৃষ্ণা। প্রার্থনা।