অন্তরে প্রেমের দীপ জ্বলে যার ( ontore premer dip jole jar)
অন্তরে প্রেমের দীপ জ্বলে যার,
ত্রিভুবনে নাই তার কোথাও আঁধার॥
পথের ধূলি তারই চরণ যাচে
আকাশ কথা কয় তাহারি কাছে,
তা'রি তরে খোলা থাকে সকলের ঘর
সকলের হৃদয়-দুয়ার॥
কে বলে ভিখারিনী সে ─ কে বলে সে ভিখারি।
ভিক্ষা-ঝুলিতে তার বিশ্ব থাকে ─ ভগবান তাহার দ্বারী॥
তার রীতি বোঝা যায় না
বুকে যার বহে নিতি পিরিতি-জোয়ার॥
- ভাবসন্ধান: মানবধর্মের প্রেমই মানুষের প্রকৃত ঐশ্বর্য। যার অন্তর প্রেমে আলোকিত, সে বাহ্যিকভাবে দরিদ্র হলেও প্রকৃত অর্থে বিশ্বসম্পদের অধিকারী। প্রেম তাকে মানুষ, প্রকৃতি এবং পরমসত্তার সঙ্গে এমন একাত্মতায় যুক্ত করে, যেখানে ভেদাভেদ, দারিদ্র্য ও অন্ধকারের কোনো স্থান থাকে না। এই ভাবদর্শে রচিত এই গানে কবি মানুষের প্রেমিক সত্তাকে উপস্থাপন করেছেন - নানা রূপকল্পে। কবি মনে করেন- যার অন্তরে প্রেমের দীপ জ্বলে, তার জীবন থেকে অন্ধকার দূর হয়ে যায়। এখানে ‘প্রেমের দীপ’ শুধু পার্থিব প্রেমের প্রতীক নয়; এটি মানুষের অন্তরে জাগ্রত সেই সর্বজনীন প্রেম, যা তাকে সকল মানুষ ও সমগ্র বিশ্বজগতের সঙ্গে এক গভীর আত্মীয়তার বন্ধনে যুক্ত করে। এই প্রেমের আলোয় আলোকিত মানুষের কাছে ত্রিভুবনের কোথাও আর অন্ধকার থাকে না।
কবি মনে করেন, এমন প্রেমময় মানুষের প্রতি প্রকৃতিও যেন আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। পথের ধূলি তার চরণস্পর্শ কামনা করে, আকাশ তার সঙ্গে কথা বলে। এই কাব্যিক চিত্রের মধ্য দিয়ে বোঝানো হয়েছে যে, প্রেমিক হৃদয়ের কাছে জগৎ আর জড় ও নীরব থাকে না; সমগ্র প্রকৃতি তার আপন হয়ে ওঠে। সকলের ঘর এবং সকল মানুষের হৃদয়ের দ্বার তার জন্য উন্মুক্ত থাকে। কারণ সত্যিকার প্রেম মানুষকে সংকীর্ণতা, ভেদবুদ্ধি ও আত্মকেন্দ্রিকতার ঊর্ধ্বে নিয়ে যায়।
এরপর কবি বাহ্যিক দারিদ্র্য ও প্রকৃত ঐশ্বর্যের একটি গভীর বৈপরীত্য তুলে ধরেছেন। যাকে মানুষ ভিখারি বা ভিখারিনী বলে অবজ্ঞা করে, সে-ই হয়তো প্রকৃত অর্থে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী। তার ভিক্ষার ঝুলিতে বস্তুগত সম্পদ না থাকলেও তার হৃদয়ে রয়েছে সমগ্র বিশ্বকে ধারণ করার মতো প্রেমের ঐশ্বর্য। তাই কবি বলেন—‘ভগবান তাহার দ্বারী’। অর্থাৎ প্রেমে সমৃদ্ধ মানুষের কাছে এমন এক আধ্যাত্মিক মহিমা রয়েছে যে, পরমসত্তাও যেন তার সেবক বা দ্বাররক্ষকেরূপে অবস্থান করেন। এটি মানুষের অন্তর্নিহিত প্রেমশক্তির সর্বোচ্চ মহিমাকে প্রকাশ করে।
গানের শেষ পঙ্ক্তিতে কবি বলেন, যার হৃদয়ে প্রতিনিয়ত প্রেমের জোয়ার বহে, তার জীবনযাপনের রীতি সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা সহজ নয়। কারণ তার মূল্যবোধ বাহ্যিক সম্পদ, সামাজিক মর্যাদা বা প্রচলিত হিসাবের দ্বারা নির্ধারিত হয় না। সে প্রেমের এক ভিন্ন জগতে বাস করে। - রচনাকাল ও স্থান: গানটির সুনির্দিষ্ট রচনাকাল পাওয়া যায় না।
- গ্রন্থ:
- সন্ধ্যামালতী। প্রথম সংস্করণ। কাজী নজরুল ইসলাম [মিত্র ও ঘোষ। কলকাতা, শ্রাবণ ১৩৭৭]। গান: ৩৩। পৃষ্ঠা: ১৭।
- নজরুল-রচনাবলী জন্মশতবর্ষ সংস্করণ। সপ্তম খণ্ড । [বাংলা একাডেমী ঢাকা। নভেম্বর ২০০৮] গান সংখ্যা ৩২। পৃষ্ঠা: ১৪২
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২। রাগ: জৌনপুরী, তাল: দাদরা । গান সংখ্যা ১০০৭। পৃষ্ঠা: ৩০৮]
- পর্যায়: ধর্মসঙ্গীত। মানবধর্ম। প্রেম