আমি বুকের ভিতর থাকি তবু ওরা ডাকে দেখা দাও ব’লে (ami buker bhitor thaki)
আমি বুকের ভিতর থাকি তবু ওরা ডাকে দেখা দাও ব’লে।
ওরা চিনিতে পারে না কত রূপে আমি দেখা দিই কত ছলে॥
চোর চোর খেলি মনে বসে, ওরা বনে যায় খুঁজিতে;
কোলে থাকি আমি খোকা হয়ে, ওরা মন্দিরে যায় পূজিতে।
মোরে পাষাণ করিয়া ফেলে রাখে, ওরা আঁধার দেউল তলে॥
(ওরা ডাকিয়া লয় না কোলে গো আমি কোল্ যে বড় ভালবাসি।)
কেশবে ডাকিয়া লয় না কোলে॥
ওরা দেবতা ভাবিয়া পূজা দেয় যাহা, আমি তাহা নাহি খাই;
লুকায়ে ভিখারি সাজিয়া ওদের পাতের অন্ন চাই।
ওরা প্রভু ব’লে মোরে দূরে রাখে, তাই কেঁদে দূরে যাই চ’লে।
(ওরা গোপাল বলিয়া ডাকে না মোরে, কেন বুকে বেঁধে রাখে না।)
আমি তাই দূরে যাই চ’লে, কেশবে ডাকিয়া লয় না কোলে॥
- ভাবসন্ধান: সনাতন হিন্দু ধর্মমতে কেশব (বিষ্ণু) প্রজাদের রক্ষা দেবতা হিসেবে, সর্বত্র বিরাজ করেন। তিনি থাকেন ভক্তের ভক্তির গভীরে মনের ঘরে কিন্তু তাঁর ভক্তরা তাঁকে পাওয়ার জন্য অনর্থক ইতস্তত নানা ভাবে নানা জায়গায় খুজে বেড়ান। ভক্তরা চান কেশব তাঁদেরকে পরম স্নেহে কোলে আশ্রয় দিন। কিন্তু ভক্তরা যথাস্থানে তাঁর অন্বেষণ করেন না বলেই কেশবের কোলে তাঁদের স্থান হয় না।
কেশব থাকেন ভক্তেরই মনের ঘরে পরমাত্মা রূপে। ভক্তরা জানেন না বলেই তাঁরা তাঁদের মনের গভীরে না খুঁজে বলে বৃথাই কেশবকে 'দেখা দাও বলে' ডাকেন। কেশব নানা রূপে নানা ছলে ভক্তকে দেখা দেন, কিন্তু তাঁরা তাঁকে দেখতে পান না। তিনি মনের ঘরে 'চোর চোর' খেলায় মেতে থাকেন। ভক্তরা তা বুঝতে পারে না বলেই তাঁরা তাপস হয় তাঁকে বনে বনে মরেন। তিনি শিশুর বেশে মায়ের কোলে থাকেন, অথচ ওঁরা মন্দিরে যান পূজা করতে। আরাধ্য দেবতা ভেবে ভক্তরা তাঁকে পাষাণের মূর্তি করে অন্ধকার মন্দিরে ফেলে রাখেন। তাই কেশবের কোলে ওঁদের স্থান হয় না।
ভক্তরা পাষাণ প্রতিমাকে দেবতা জ্ঞানে পূজা দেন, অন্নের অর্ঘ দানন করেন। কিন্তু কেশব তা স্পর্শও করেন না। বরং তিনি ভিখারির বেশে ভক্তেরই পাতের অন্ন প্রার্থনা করেন। না বুঝে ভক্তরা তাঁকে প্রভু জ্ঞানে মনের আঙিনা থেকে দূরে রেখে দেন। ওঁরা তাঁকে গোপাল নামে, কেশব নামে কেউ পরম ভক্তিতে ডাকেন না। তাই তিনি ভক্তদের কাছ থেকে দূরে সরে যান।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের ৩রা মার্চ (রবিবার ১৯ ফাল্গুন ১৩৪৬), মণিলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচিত 'অন্নপূর্ণা' নামক নাটক মঞ্চস্থ হয়। এই নাটকে এই গানটি প্রথম ব্যবহৃত হয়েছিল। ধারণা করা হয়, নজরুল এই নাটকের জন্যই রচনা করেছিলেন। এই সময় নজরুল ইসলামের বয়স ছিল ৪০ বৎসর ৯ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ১১৩৩। পৃষ্ঠা: ৩৪৫-৩৪৬। ]
- মঞ্চ: অন্নপূর্ণা । মণিললাল বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত নাটক। মিনার্ভা থিয়েটার, কলকাতা। [৩ মার্চ (রবিবার ১৯ ফাল্গুন ১৩৪৬)। শিল্পী: শেফালিকা]।
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দধধর্ম। বৈষ্ণসঙ্গীত। বিষ্ণু। অধরা