আমি মা ব’লে যত ডেকেছি, সে-ডাক নূপুর হয়েছে ও-রাঙা পায় (ami maa bole joto dekechi)

আমি মা ব’লে যত ডেকেছি, সে-ডাক নূপুর হয়েছে ও-রাঙা পায়।
মোর শত জনমের কত নিবেদন, চরণ জড়ায়ে কহিয়া যায়॥
মাগো তোরে নাহি পেয়ে লোকে লোকে
            যত অশ্রু ঝরেছে মোর চোখে,
সেই আঁখিজল জবা ফুল হয়ে, শোভা পেতে ঐ চরণ চায়॥
মাগো কত অপরাধ করেছিনু বুঝি, সংহার ক’রে সে-অপরাধ,
বল লীলাময়ী, মিটেছে কি তোর মুণ্ডমালিকা পরার সাধ।
            যে ভক্তি পায়নি চরণতল
            আজ হয়েছে তা বিল্বদল,
মোর মুক্তির তৃষা মুক্তকেশী গো, এলোকেশ হয়ে পায়ে লুটায়॥

  • ভাবসন্ধান: এই গানটিতে প্রকাশ পেয়েছে শ্যামা মায়ের কাছে সাধকের পরম আত্মনিবেদন। সাধক মনে করেন, তিনি যতবার মাতৃরূপিনী শ্যামা-কে মা ব'লে ডেকেছেন, ততবারই সে ডাক যেন নূপর হয়ে আশ্রয় নিয়েছে তাঁর রাঙা পায়ে। তারপরেও সাধকের কামনা, তাঁর শত জনমের নিবেদন যেন দেবীর পায়ে নূপুর হয়ে ধ্বনিত হয়।

    সাধকের শত জনমের সাধনা বিফলে গেছে, তিনি বঞ্চিত হয়েছেন দেবীর অপার স্নেহ থেকে। সাধক মনে করেন তাঁর এই সাধনা বিফলে যায় নি। তাই দেবীর স্নেহ-বঞ্চিত সাধকের প্রতিটি বিফল বাসনা- মর্মবেদনার অশ্রু হয়ে ঝরে পড়েছে।  দেবীর করুণা লাভে ব্যর্থ সাধকের এই অশ্রু যেন দেবীর পায়ে নিবেদিত জবা ফুল হয়ে, তাঁরই শ্রীচরণের শোভা পাওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে।

    দেবীর করুণা পাওয়ার ব্যর্থতা সাধকের মনে হাহাকার হয়ে জেগে ওঠে। তাই সাধক ভাবেন- জন্মজন্মান্তরে অজানিত অগণন অপরাধের কারণেই হয়তো দেবীর কাছে তিনি অপাঙ্‌ক্তেয় হয়ে রয়েছেন।  হয়তো এর আগে পাপী সাধকের পাপ সংহার করে, তাঁর মুণ্ডু দিয়ে গ্রথিত মালা কণ্ঠে দেবী ধারণ করেছেন। তাই সাধক অভিমান ভরে আত্মমগ্নতা থেকে ভাবেন এখনো লি তাঁর মুণ্ডু বিসর্জেনর পালা শেষ হয় নি।

    সাধক কবি ভাবেন অতীতের তাঁর নিবেদিত সকল ভক্তি দেবী গ্রহণ করেন নি, কিন্তু সর্বশেষ নিবেদনে এসে সাধক অনুভব করেছেন, তাঁর সকল ব্যর্থ ভক্তিগুলো যেন বিল্বদল (হরপার্বতীর পূজায় নিবেদিত বেলপাতা) দেবীর পায়ে স্থান পেয়েছে। কবি এই পার্থিব সংসার যাতনা থেকে মুক্ত হয়ে, দেবীর চরণে নিবেদিত হতে চান। তাঁর মুক্তির তৃষ্ণা যেন মুক্তকেশী হয়ে দেবীর পায়ে স্থান পায়, সাধকের এই আত্ম-সমর্পণের কামনাই তাঁর পরম সাধনা।

     
  • রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের ২০ নভেম্বর ১৯৩৯ (সোমবার, ৪ অগ্রহায়ণ ১৩৪৬) কলকাতা বেতারকেন্দ্র থেকে 'রক্তজবা' নামক একটি গীতি-আলেখ্য প্রচারিত হয়েছিল। এই গীতি-আলেখ্যে এই গানটি ছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৪০ বৎসর ৬ মাস।
     
  • রেকর্ড: সেনোলা। জুন ১৯৪৩ (জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় ১৩৫০)। কিউ এস ৬০৩। শিল্পী: কৃষ্ণদাস ঘোষ। সুরকার: কাজী নজরুল ইসলাম]
     
  • বেতার:
    • রক্তজবা । (গীতিচিত্র),। রচয়িতা: অবিনাশ বন্দ্যোপাধ্যায়। কলকাতা বেতার কেন্দ্র। ২০ নভেম্বর ১৯৩৯ (সোমবার, ৪ অগ্রহায়ণ ১৩৪৬)। সান্ধ্য অনুষ্ঠান। সন্ধ্যা ৬.১০।

সূত্র:
বেতার জগৎ। ১০ম বর্ষ, ২২শ সংখ্যা। পৃষ্ঠা: ৮৭৭
নজরুল যখন বেতারে। আসাদুল হক। বাংলাদেশ শিল্পকলা একডেমী। মার্চ ১৯৯৯। পৃষ্ঠা: ৭৬।

  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। শাক্ত সঙ্গীত। শ্যামাসঙ্গীত। আত্ম-নিবেদন

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।