আর কত দুখ দেবে, বল মাধব বল (ar koto dukh debe, bol madhob bol)
আর কত দুখ দেবে, বল মাধব বল বল মাধব বল।
দুখ্ দিয়ে যদি সুখ পাও তুমি কেন আঁখি ছলছল॥
তব শ্রীচরণ তলে আমি চাহি ঠাঁই,
তুমি কেন ঠেল বাহিরে সদাই;
আমি কি এতই ভার এ জগতে যে, পাষাণ তুমিও টল॥
ক্ষুদ্র মানুষ অপরাধ ভোলে তুমি নাকি ভগবান,
তোমার চেয়ে কি পাপ বেশি হ’ল (মোরে) দিলে না চরণে স্থান।
হে নারায়ণ! আমি নারায়ণী সেনা,
মোরে কুরুকুল দিতে ব্যথা কি বাজে না,
(যদি) চার হাতে মেরে সাধ নাহি মেটে দু’চরণ দিয়ে দ’ল॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে মাধব-বিরহিণী রাধার অভিমানভরা মর্মবেদনা উপস্থাপন করা হয়েছে। মাধব (কৃষ্ণ) তাঁকে ছাড়ে চলে গেছেন। রাধা তাঁর মাধবকে তাঁর প্রেমে-মায়ায় ধরে রাখতে পারেন নি, এ বেদনাভার তাঁকে একাকী বহন করতে হচ্ছে। কিন্তু তাঁর মনের মাঝে সর্বদা বিরাজ করে সে মাধব। এই গানের বিরহিণী রাধার সাথে, হৃদয়াসনে বিরাজিত সেই মাধবের চলে অহর্নিশি বিরহ-বেদনার লীলা। এ গানের নায়িকা রাধার সাথে মাধবের কথোপকথন চলে মনের অন্তর্লোকে, সঙ্গোপনে।
এই মন-মাধবের কাছে অকপটে রাধা তাঁর কাছে জানতে চান- আর কত দুঃখ দেব সেই মাধব। দুঃখ দিয়ে যদি তাঁর এতই সুখ, তাহলে তাঁরই চোখে বা কেন দেখা দেয় এই অশ্রু-আভাস। রাধা তাঁর মন-মাধবের প্রেম-পদতলে নিজেকে সঁপে দিতে যান, কিন্তু তিনি তাঁকে বার বার দূরে ঠেলে দেন।
তাঁর প্রেম-কামনা কি এ্তটাই অসহনীয় যে, তার ভারে জগদীশ্বর মাধব টলে পড়ে- এই জিজ্ঞাসা জাগে রাধার মনে। অনুযোগের সুরে রাধা বলেন- ক্ষুদ্র মানুষও অপরাধ ক্ষমা করে দেয়, কিন্ত ভগবান হয়েও মাধব কেন তাঁর অপরাধ ক্ষমা করতে পারেন না। জগতে সকল পাপের ঊর্ধে ভগবান। সেই ভাগবান তাঁর সকল অপরাধ ক্ষমা করে দিয়েও তাঁকে তাঁর চরণে কেন স্থান দিতে পারেন না, তা রাধার বোধগম্য নয়। রাধা মনে করেন, মাধব যদি নারায়ণ হয়, মাধবের প্রেম-শক্তিরূপী রাধা হলেন নারায়ণী সেনা। কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধে নারায়ণ (কৃষ্ণ) নিজে পাণ্ডব পক্ষে থেকে, তাঁর নারায়ণী সেনা কুরুকুল-পতিকে দান করেছিলেন। রাধা এই গানে মন-মাধবকে সেই উপমায় নিজেকে নারায়ণী সেনার মতো নিজেকে পরিত্যাজ্য হিসেবে তুলে ধরেছেন। রাধার আক্ষেপ নারায়ণী সেনার মতো তাঁকে সরিয়ে দিতে মাধবের মনে কোনো বেদনা বিচলিত করছে না। যদি মাধবের চার হাতের অলৌকিক শক্তি দিয়ে, তাঁকে যাতনা দিয়ে তাঁর সাধ না মেটে, তবে দুই পায়ে পিষ্ট করে তাঁর যাতনা দেবার সাধ মিটিয়ে নিক। এত কিছুর পরে রাধা তাঁর মন-মাধবের কাছে তাঁর নিবেদন, যেন তাঁর প্রেমের টানে মন-মাধব তাঁর হৃদয়াসন ছেড়ে মর্তের মাধব হয়ে নেমে আসুক তাঁর প্রণয়ের ভুবনে।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের মে (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৭) মাসে মেগাফোন থেকে গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৪০ বৎসর ১১ মাস।
- রেকর্ড:
- মেগাফোন। মে ১৯৪০ (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৭)। জেএনজি ৫৪৭৩। শিল্পী: ভবানীচরণ দাস। সুরকার: নজরুল ইসলাম
- মেগাফোন। ফেব্রুয়ারি ১৯৪৪ (মাঘ-ফাল্গুন ১৩৫০) জেএনজি ৬০১৮। শিল্পী: ভবানী দাস। সুরকার: নজরুল ইসলাম[শ্রবণ নমুনা]
- এইচএমভি। অক্টোবর ১৯৪৮ (আশ্বিন-কার্তিক ১৩৫৫)। এন ২৭৯২০। শিল্পী: মৃণালকান্তি। ঘোষ সুরকার: মৃণালকান্তি ঘোষ [শ্রবণ নমুনা]
- স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি:
- সালাউদ্দিন আহ্মেদ। ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি থেকে প্রকাশিত গানের [শিল্পী: ভবানী দাস] সুরানুসারে স্বরলিপিটি নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি [নমুনা]
- ইদ্রিস আলী। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে মেগাফোন রেকর্ড কোম্পানি থেকে প্রকাশিত গানের [শিল্পী: ভবানী দাস] সুরানুসারে স্বরলিপিটি নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি আটচল্লিশতম খণ্ডে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। [নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণবসঙ্গীত। রাধাকৃষ্ণ লীলা। বিরহ।
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্য
- তাল: দাদরা
- গ্রহস্বর:
- রমা [সালাউদ্দিন আহ্মেদ-কৃত স্বরলিপি]
- স [ইদ্রিস আলী-কৃত স্বরলিপি]