আল্লা নামের নায়ে চ’ড়ে যাব মদিনায় (allah namer naye chore jabo modinay)
আল্লা নামের নায়ে চ’ড়ে যাব মদিনায়।
মোহাম্মদের নাম হ’বে মোর (ও ভাই) নদী-পথে পুবান বায়॥
চার ইয়ারের নাম হ’বে মোর সেই তরণীর দাঁড়
কল্মা শাহাদতের বাণী হাল ধরিবে তা’র,
খোদার শত নামের শুন্ টানিব (ও ভাই) নাও যদি না যেতে চায়॥
মোর নাও যদি না চলিতে দেয় সাহারার বালি,
মরুভূমে বান ডাকাব, (চোখের) পানি দিব ঢালি’।
তাবিজ হ’য়ে দুল্বে বুকে কোরান, খোদার বাণী
আঁধার রাতে ঝড়-তুফানে১ আমি কি ভয় মানি!
আমি তরে’ যাব রে তরী যদি ডুবে’ তারে না পায়২॥
১. দুর্দিনেরই ঝড়-তুফানে
২. ডুবে তাঁহার এলাকায়
- ভাবসন্ধান: এই গানে ইসলামের নবযাত্রার সূচনার কথা বলা হয়েছে নানা রূপকল্পের মাধ্যমে। এ গানে মদিনা হলো নবযাত্রার লক্ষ্য। ইসলামের এই নবযাত্রায় ইসলাম ধর্মদর্শনকে নৌকার সাথে তুলনা করা হয়েছে। আর পুরো গানে এই নৌকা চালিয়ে নেওয়ার দিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
৬২২ খ্রিষ্টব্দের ২৪শে সেপ্টেম্বর ইসলাম ধর্মের নবী হজরত মুহম্মদ (সাঃ) মক্কা থেকে মদিনা নগরীতে আসেন। পরে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রথম রাজধানী হিসেবে মদিনা স্বীকৃত হয়। আল্লাহর উপর বিশ্বাস রেখে, তাঁরই নির্দেশে নবী মদিনায় হিজরত করেছিলেন। সেই বিশ্বাসের সূত্রেই এই গানে কবি 'আল্লা নামের নায়ে চ’ড়ে যাব মদিনায়'- পঙ্ক্তিটি ব্যবহার করেছেন। বাংলাদেশের নদীতে নৌকার মাঝিরা অনুকুল পুবালি বাতাস ব্যবহার করে নৌযান চালায়। এই রূপকতায় কবি এ গানের দ্বিতীয় পঙ্ক্তিতে ইসলামের অগ্রযাত্রার মূল শক্তি হিসেবে আল্লার নামকে অবলম্বন বা মূল চালিকাশক্তিকে নির্দেশিত করেছেন। এ গানের নদী পথ হলো- ইসলামের অগ্রযাত্রার পথ। আর 'পুবান বায়' হলো যাত্রা পথের অনুকূল পরিবেশ।
এই যাত্রা পথের চার ইয়ার হলেন চার খলিফা। যাঁদের অমিত তেজে নবীর মৃত্যুর পর ইসলামের জয়যাত্রা অব্যহত ছিল। তাই এই গানে অগ্রযাত্রার চালিকা শক্তির প্রতীক হিসেবে চার খলিফার কথা বলা হয়েছে। এই যাত্রা পথের মূল মন্ত্র হবে কালমায় বিশ্বাস রাখা। যার মূল কথা- আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয় এবং হজরত মুহম্মদ (সাঃ) তাঁর প্রেরিত রসুল। ইসলাম নামক নৌকা টানার জন্য, আল্লার শত নামকে নৌকা টানার শত গুণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
কবি এই নৌকা চালনার চরম প্রতিকূল অবস্থা বুঝাতে সাহারা মরুভূমির বালিয়াড়ির কথা উল্লেখ করেছেন। এই প্রতিকূল দশায় নৌকা চালাতে গিয়ে মরুভূমিকেই নৌকা চালনার উপযোগী করাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কঠোর পরিশ্রমের দ্বারা সৃষ্ট অনুকুল পরিবেশ তৈরির উপাদান হিসেবে চোখের জলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই চোখের জলের বন্যা তৈরি করে ইসলামের জয়যাত্রা পথ সুগম করে নেবেন, এমন দৃঢ়তার কথাই ব্যক্ত করা হয়েছে।
এই যাত্রার রক্ষা কবজ হবে কুরআনের বাণী তথা আল্লাহর বাণী। কবি মনে করেন- দিশাহীন অন্ধকারের পথে নানা রূপ ঝড়তুফানে এই তাবিজই রক্ষা করবে এই তরীকে। তাতে মাঝিকে ভয় না মানা দৃঢ়তা দেখাতে হবে। এই ভাবে কবি এই তরীতে চড়ে এগিয়ে যাবেন এমনটাই তাঁর বিশ্বাস। নৌকা ডুবিতে যদি তিনি মদিনায় পৌছাতে নাও পারেন, তবুও তিনি এ যাত্রায় অটল থাকবেন।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল (চৈত্র ১৩৪৭-বৈশাখ ১৩৪৮) মাসে, সেনোলা রেকর্ড কোম্পানি গানটির একটি রেকর্ড প্রকাশ করেছিল। এই সময় নজরুল ইসলামের বয়স ছিল ৪১ বৎসর ১০ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সংগীত সংগ্রহ [রশিদুন্ নবী সম্পাদিত। কবি নজরুল ইন্সটিটিউট। তৃতীয় সংস্করণ দ্বিতীয় মুদ্রণ, আষাঢ় ১৪২৫। জুন ২০১৮। গান ১১১১। পৃষ্ঠা ৩৩৯]
- রেকর্ড: সেনোলা [এপ্রিল ১৯৪১ (চৈত্র ১৩৪৭-বৈশাখ-১৩৪৮ )। কিউএস ৫২১। শিল্পী: নীলম খাতুন]
- সুরকার: নজরুল ইসলাম
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। উদ্দীপনা