জগতের নাথ কর পার হে (jogoter nath koro par he)

জগতের নাথ কর পার হে
মায়া-তরঙ্গে টলমল তরণী অকূল ভব পারাবার হে॥
নাহি কাণ্ডারি ভাঙা মোর তরী আশা নাই কূলে উঠিবার
আমি গুণহীন ব’লে করো যদি হেলা শরণ লইব তবে কার॥
সংসারেরি এই ঘোর পাথারে ছিল যারা প্রিয় সাথি
একে একে তারা ছাড়িয়া গেল হায় ঘনাইল যেই দুখ-রাতি।
                ধ্রুবতারা হয়ে তুমি জ্বালো
                অসীম আঁধারে প্রভু আশারই আলো
তোমার করুণা বিনা হে দীনবন্ধু, পারের আশা নাহি আর॥

  • ভাবসন্ধান: এই গানটিতে মায়াময় জগতের অপার দুঃখ-যাতনার বিপন্ন তরীরূপী জীবনের দুঃসহ দশা থেকে উদ্ধারের জন্য জগতের প্রভু পরমসত্তার কাছে প্রার্থনা করা হয়েছে।

    কবি এই দুঃখ-যাতনাময় যাপিত জীবনের পরিবেশকে উপস্থাপন করেছেন মায়াময় ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ মায়াসাগরের সাথে।  এই অকূল ভব-সাগরে তাঁর যাপিত জীবনতরী মায়া-তরঙ্গে টলমল। কারণ এই তরীর মাঝি নেই। কবি মনে করেন এমন অবস্থায় তাঁর আশার তরী কূলে তথা পরম লক্ষে হয়তো পৌছাতে পারবে না।  কারণ কবি গুণহীন। এখানে গুণহীন শব্দটি দ্ব্যর্থক। হতে পারে তাঁর জীবন তরীকে টেনে নেওয়ার জন্য গুণ নামক দড়ি-টানা নাবিক নেই। অন্য অর্থে, তাঁর বলার মতো কোনো গুণ নেই। উভয় অর্থে তিনি আশাহীন হয়ে পরমসত্তার কাছে নিজেকে কাঙালের মতো নিবেদন করেছেন। তিনি তাঁর কাছে আত্মনিবেদনের সুরে সবিনয় বিনীত প্রশ্ন রাখেন- যদি অবহেলা করে তিনি তাঁকে আশ্রয় না দেন, তবে তিনি কার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করবেন?।

    যখন তাঁর জীবনে নেমে এলো গভীর সঙ্কট, তখন বন্ধু রূপে সংসারে যাঁরা ছিলেন তাঁর পাশে, তাঁরা একে একে ছেড়ে চলে গেছেন।  একমাত্র পরম সত্তাই ধ্রুবতারার মতো তাঁর অন্ধকার জগতে নিষ্কম্প আশার জ্যোতি জ্বালিয়ে রেখেছিলেন। তাই কবি আশাহীন ভবসংসার পারি দেওয়ার একমাত্র সহায় হিসেবে তাঁর কাছে নিজেকে নিবেদন করেছেন। কারণ তিনি জানেন- এই পরমসত্তাই তাঁর দীনবন্ধু হয়ে দেখা দেবেন। তাঁর করুণা ছাড়া এই ভব সংসার পাড়ি দেবার বন্ধু আর কেউ নেই।

     
  • রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি (মাঘ-ফাল্গুন ১৩৪৬) মাসে এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৪০ বৎসর ৮ মাস।

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।