জরীন হরফে লেখা রূপালি হরফে লেখা (jorin horofe lekha rupali horofe lekha)
জরীন হরফে লেখা
রুপালি হরফে লেখা
(নীল) আসমানের কোরআন।
সেথা তারায় তারায় খোদার কালাম
(তোরা) পড়্ রে মুসলমান
নীল আসমানের কোরআন॥
সেথা ঈদের চাঁদে লেখা
মোহাম্মদের 'মীম'-এর রেখা,
সুরুযেরই বাতি জ্বেলে' পড়ে রেজোয়ান॥
খোদার আরশ লুকিয়ে আছে ঐ কোরআনের মাঝে,
খোঁজে ফকির-দরবেশ সেই আরশ সকাল-সাঁঝে।
খোদার দিদার চাস্ রে, যদি
পড়্ এ কোরআন নিরবধি;
খোদার নূরের রওশনীতে রাঙ রে দেহ-প্রাণ॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে প্রকৃতির মাধ্যমে আল্লাহর কালাম (কুরআন)-এর যে মহিমা উদ্ভাসিত, তা পাঠের আহ্বান জানানো হয়েছে সন্ধ্যা ভাষার প্রকাশ ভঙ্গিতে।
এগানে নীলাকাশকে "নীল আসমানের কুরআন" হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। যেখানে সৃষ্টির প্রতিটি উপাদানে (তারা, চাঁদ, সূর্য) লেখা আছে রহস্যময় খোদার বাণীর মহিমা। এই রূপকতার মধ্য দিয়ে এই গানে উপস্থাপিত হয়েছে- আল্লার কুরআনের বাণী এবং 'আল্লাহ সর্বত্র বিরজমান'- এই অমোঘ বাণী।
গানটির শুরুতে রূপকতার আশ্রয়ে বলা হয়েছে- এই নীলাকাশই যেন সোনালি রুপালি অক্ষরে লেখা কুরআন। আর তারা-তারায় যেন লেখা রয়েছে খোদার কালাম। তাই কবি সকল মুসলমানদের এই কুরআন পাঠ করার অনুরোধ করেছেন। কবি মনে করেন কুরআনের গভীর আধ্যাত্মিক দর্শন এবং আল্লাহর মহিমা উদ্ভাসিত হয়ে আছে মহাকাশের মাঝে। এখানে রয়েছে পুরো সৃষ্টি জগতের রহস্যময় বাণী। সে সকল বাণী আয়াতের মতো ছড়িয়ে আছে আকাশের নীল রঙে, আর জ্ঞানের আলোকিত অক্ষরে তারায় তারায়।
গানের দ্বিতীয় অংশে কবি ঈদের অর্ধচন্দ্রাকার চাঁদে সন্ধান করেছেন- মোহাম্মদের 'নামের প্রথম বর্ণ মীম'-এর রেখা। এ এক অমোঘ বাণী, যা শুধু মানুষ নয়- সূর্যের আলো জ্বেলে দিয়ে রেজওয়ান (জান্নাতের দ্বাররক্ষী ফেরেশতা) পড়ে সেই বাণী।
গানটির তৃতীয় অংশে কবি উল্লেখ করেছেন- খোদার আরশের (সিংহাসন/উচ্চতম স্থান) কথা। এই আকশের মাঝেই লুকিয়ে রয়েছে আসমানি কুরআন। কুরআন সাক্ষ্য দেয়- যা সংরক্ষিত আছে লাওজে মাহফুজে। ফকির-দরবেশরা সকাল-সন্ধ্যায় সেই আরশ খোঁজে। কবির পরামর্শ যদি কেউ খোদার দর্শন (দিদার) চায়, তাহলে নীকালকাশের নিরন্তর এই কুরআন পাঠ করে- খোদার নূরে রাঙিয়ে নিতে পারে তার দেহ-প্রাণ। ইসলাম ধর্মমতে কুরআন পাঠের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ হয়, আরশের সান্নিধ্য পাওয়া যায়। নজরুল এখানে কুরআনকে জীবন্ত, প্রকৃতি-সংযুক্ত ও আধ্যাত্মিক আলোকবর্তিকা হিসেবে দেখিয়েছেন।
এই গানটি কুরআনের সার্বজনীনতা ও প্রকৃতিতে তার উপস্থিতি তুলে ধরে। শুধু বই পড়ে নয়, প্রকৃতি তথা আকাশ-তারা-চাঁদ-সূর্যের দিকে তাকিয়ে খোদার আয়াত পাঠ করে খোদার নূরে রঙিন হওয়ার আহ্বান। এটি ইসলামী ভক্তি, প্রকৃতি-প্রেম ও আধ্যাত্মিক জাগরণের এক অপূর্ব মিশ্রণ। - রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ (ফাল্গুন-চৈত্র ১৩৪৫) মাসে, টুইন রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৯ বৎসর ৯ মাস।
- রেকর্ড: টুইন [ মার্চ ১৯৩৯ (ফাল্গুন-চৈত্র ১৩৪৫)। এফটি ১২৭৩৭। শিল্পী: আব্বাস উদ্দীন]
- স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি: রশিদুন্ নবী । নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি (দশম খণ্ড)। প্রথম প্রকাশ, ৩ ফাল্গুন, ১৩৯৯ বঙ্গাব্দ/ ২৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দ। অষ্টম গান] [নমুনা]
- পর্যায়
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলামী গান। ধর্মাঙ্গ। কুরআন পাঠ।
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্য
- তাল: দাদরা
- গ্রহস্বর: সজ্ঞা