জাগো জোগো গোপাল নিশি হ’ল ভোর (jago jago gopal nishi holo vor)
জাগো জোগো গোপাল নিশি হ’ল ভোর,
কাঁদে ভোরের তারা হেরি’ তোর ঘুম-ঘোর॥
দামাল ছেলে তুই জাগিস্নি তাই
বনে জাগেনি পাখি ঘুমে মগ্ন সবাই,
বাতাস নিশ্বাস ফেলে খুঁজিছে বৃথাই
তোর বাঁশরি লুটায়ে কাঁদে আঙিনায় মোর॥
তুই উঠিস্নি ব’লে দেখ রবি ওঠেনি
ঘরে আনন্দ নাই, বনে ফুল ফোটেনি।
ধোয়াবে বলিয়া তোর মুখের কাজল
থির হ’য়ে আছে ঘাটে যমুনার জল,
অঞ্চল-ঢাকা মোর, ওরে চঞ্চল,
আমি চেয়ে আছি কবে ঘুম ভাঙিবে তোর॥
- ভাবসন্ধান: এ গানে মাতৃস্নেহ তথা বাৎসল্য রসের এক অপূর্ব প্রকাশ ঘটেছে। এ গানের গোপাল হলেন বৃন্দাবনের গোপালকরূপী বালক শ্রীকৃষ্ণ। রাত্রি শেষে ভোরে আলো ফুটে উঠেছে। তখনো গোপাল শয্যা ছাড়েনি। তাই মা যশোদা তাঁকে সস্নেহে ডাকছেন। কারণ যশোদা জানেন তাঁর গোপাল না জাগলে পুরো বিশ্ব-প্রকৃতি, সূর্য-চাঁদ-তারা-পাখি-ফুল-বাতাস সবকিছু অচল, বিষণ্ণ ও অপেক্ষমাণ হয়ে পড়ে। গোপালের জাগরণেই জগতে আনন্দ, সৌন্দর্য ও সুর ফিরে আসে। এর ভিতর দিয়ে মূলত উপস্থাপিত হয়েছে কৃষ্ণ বন্দনা।
তাঁর এই ঘুম ভাঙানিয়া ডাকের অন্তরালে লুকিয়েছে বালক গোপালের জীবনাচার। তাঁর দুরন্তপনায় মা যশোদা অস্থির হয়ে থাকেন প্রতিদিন, অস্থির হয়ে ওঠে বৃন্দাবনের প্রকৃতি। এ সবই যেন প্রকৃতি ও মায়ের অংশ। তাই গোপাল জাগে নি বলে- উভয়ই উদ্বিগ্ন, অস্থিরতা নেই বলে যেন উভয়ই অস্থির। যশোদা সেই অস্থিরতা থেকে মুক্ত হয়ে- আনন্দময়ী হয়ে উঠতে চেয়েছেন। তাই তাঁর এই সকাতর ঘুম ভাঙানিয়া আহ্বান।
গোপাল জাগে নি বলে যেন- ভোরের তারার ক্রন্দসী হয়ে উঠছে। সে জাগেনি বলে- বনে জাগেনি পাখি বাতাস তাঁকে খুজে না পেয়ে নিশ্বাস ফেলে খুঁজিছে বৃথাই, বাঁশরি সুর লুটায়ে কাঁদে আঙিনায়। যশোদা ভাবেন- গোপাল না জাগলে সূর্যোদয়ও যেন অর্থহীন। গোপলাবিহীন আনন্দহীন প্রকৃতিতে ফুল ফোটে না যমুনার জল যেন তাঁর চোখের কাজল ধোয়াবে বলে প্রতীক্ষায় গতিহীন হয়ে যায়। এরই মাঝে মা যশোদা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন কখন তাঁর স্নেহাঞ্চলে আবরিত দুরন্ত গোপাল জেগে উঠবে।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি (পৌষ-মাঘ ১৩৪৫) মাসে এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি থেকে এই গানটির একটি রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৯ বৎসর ৭ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ৭৭৩
- রেকর্ড: এইচএমভি [জানুয়ারি ১৯৩৯ (পৌষ-মাঘ ১৩৪৫)। এন ১৭২৩৬। শিল্পী: শীলা সরকার। সুর: অনিল ভট্টাচার্য
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার: ইদ্রিস আলী [নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি, দ্বাবিংশ খণ্ড, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা ভাদ্র, ১৪০৭/ সেপ্টেম্বর, ২০০০ খ্রিষ্টাব্দ] ১৪ সংখ্যক গান। [নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। শ্রীকৃষ্ণ। বন্দনা
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের গান
- তাল: কাহারবা
- গ্রহস্বর: সঋ