তুমি নামো হে নামো শামো হে শামো কদম্ব ডাল ছাইড়া নামো (tumi namo he namo shamo he shamo)
[কেডারে? কেডা? উ-কেলিকদম্ব গাছে এই ডাল ঐ ডাল কইরা লাফ দিয়া বেড়াইত্যাছ? ও ─
ঘোষ পাড়ার হেই বখাইট্যা পোলাটা না? উ-হুঁ-হুঁ, আবার পিরুক পিরুক কইরা বাঁশি বাজান
হইত্যাছে? নাম্যা, আসো। ভর্দুপুর বেলা মাইয়াগো সান ঘাটের কাছে ─ অ্যাঁ-হ্যা-হ্যা আবার
কিষ্ট সাজাছেন? বলি কেষ্ট সাজছো? নামো শিগগিরে নামো পোড়া কপাইল্যা নামো ─]
তুমি নামো হে নামো শামো হে শামো কদম্ব ডাল ছাইড়া নামো।
দুপরি রৌদ্রে বৃথাই ঘামো ব্যস্ত রাধা কাজে, ওহে শামো হে শামো॥
আরে তোমার ললিতাদেবী কি করতেয়াছে জাননি? তোমার ললিতাদেবী?
আরে লতিতাদেবী সলিতা পাকায়, বিশাখা ঝোলে হিজল শাখায়।
আর বৃন্দাদুতী কি করছে জান? বৃন্দাদুতী? বৃন্দাদুতী পিন্দা ধুতি
গোষ্টে গেছেন তোমার ‘পোস্টে’ সাজিয়া রাখাল সাজে
আর চন্দ্রা গ্যাছেন অন্ধ্র দেশে মান্দ্রাজী জাহাজে॥
আবার ইতি উতি চাও ক্যা? ইতি উতি চাইবার লাগছ ক্যা? ত্র্যা?
আমি কমুনা কোন্খানে তোমার যমুনা ─ তা আমি কমু না?
আরে (তুমি) ইতি উতি চাও বৃথাই আমি কমু না কোথায় তোমার যমুনা
কইলকাতা আর ঢাকা রমনার লেকে পাবে তার নমুনা।
আরে তোমার যমুনা লেক হইয়া গ্যাছে গিয়া! বুঝলা?
হালার যমুনা ল্যাক হইয়া গ্যাছে গিয়া। কলেজে ফিরিছে শ্রীদাম সুদাম
শ্রীদাম সুদাম কলেজে যাইতেয়াছে, আর তুমি এখানে বাঁশি বাজাইতেয়াছ
অ্যাঁ! পোড়া কপাইল্যা ─
কলেজে ফিরিছে শ্রীদাম সুদাম, মেরে মাল কোঁচা খুলিয়া বোতাম
লাঙ্গল ছাড়িয়া বলরাম ডাম্বেল মুঘার ভাঁজে।
ওহে শামো হে শামো আরে তুমি নামো, পোড়া কপাইল্যা নামো॥
- ভাবসন্ধান:রঙ্গ-ব্যঙ্গধর্মী এই গানে প্রাচীন বৃন্দাবনের কৃষ্ণলীলা ও আধুনিক সমাজজীবনের বৈপরীত্যকে হাস্যরসের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। কবি এখানে শ্রীকৃষ্ণকে সম্বোধন করে মজার ছলে বলতে চেয়েছেন- সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই পুরোনো বৃন্দাবন, যমুনাতীর, রাখালজীবন আর আগের মতো নেই; সবকিছুই আধুনিকতার প্রভাবে বদলে গেছে।
গানের শুরুতে কবি কৃষ্ণকে কদম্ব গাছ থেকে নেমে আসতে বলছেন। কারণ, এখন আর আগের মতো প্রেমলীলা বা বাঁশি বাজানোর সময় নেই। বৃথাই কদমের ডালে বসে দুপুরের রৌদ্রে ঘামছে, কারণ রাধার গৃহকাজে ব্যস্ত। তাঁর বৃন্দাবনের অন্যান্য সখিরা আর বাঁশি কৃ্ষ্ণের জন্য উতলা হয়ে ছুটে আসবে না। গৃহস্থালী কাজে ললিতা সন্ধ্যাদীপের জন্য সলিতা পাকাচ্ছে, পরমানন্দে বিশখা হিজল গাছে ঝোলে। বৃন্দাদূতী ধূতি গোষ্ঠ গেছে পোষ্টে গেছে। আর চন্দ্রা গেছে অন্ধরদেশে মাদ্রাজী জাহাজে।
ললিতা, বিশাখা, বৃন্দাদূতী প্রভৃতি বৃন্দাবনের চরিত্রদের আধুনিক রূপে উপস্থাপন করা হয়েছে। কেউ গৃহস্থালির কাজে ব্যস্ত, কেউ আধুনিক সাজে, কেউ আবার 'পোস্টে' রাখাল সেজে যাচ্ছে। 'চন্দ্রা গ্যাছেন অন্ধ্র দেশে মান্দ্রাজী জাহাজে'-এই পঙ্ক্তিতে যাতায়াত ও আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার প্রসঙ্গ এনে পুরোনো পৌরাণিক পরিবেশকে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এতে সৃষ্টি হয়েছে কৌতুক ও ব্যঙ্গ।
কৃষ্ণ যে যমুনার খোঁজ করছেন, সেই যমুনা আর আগের মতো নেই; তা এখন শহুরে 'লেক'-এ পরিণত হয়েছে। তার নমুনা পাওয়া যাবে 'কলকাতা আর ঢাকা রমনার লেকে। এখানে নগরায়ণ ও প্রকৃতিনাশের প্রতি সূক্ষ্ম ব্যঙ্গ রয়েছে। অর্থাৎ, আধুনিক সভ্যতা প্রকৃতির স্বাভাবিক সৌন্দর্যকে কৃত্রিমতায় বদলে দিয়েছে- তারই প্রত ইঙ্গিত করা হয়েছে।
কৃষ্ণের দুই রাখাল বন্ধু সখা শ্রীদাম আর সুদামের আর আড্ডা দেওয়ার সময় নেই। তারা গেছে কলেজে। এই অংশে রাখালবন্ধুদেরও আধুনিক শিক্ষিত তরুণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। তারা আর গরু চরায় না; কলেজে যায়, আধুনিক পোশাক পরে। এমনকি বলরামও লাঙল ছেড়ে শরীরচর্চায় ব্যস্ত। এর মাধ্যমে সমাজের জীবনধারা ও মূল্যবোধের পরিবর্তনকে রসিকতার ভঙ্গিতে প্রকাশ করা হয়েছে।
সবশেষে 'পোড়া কপাইল্যা নামো'-এই সম্বোধনে একধরনের স্নেহমিশ্রিত ঠাট্টা আছে। কবি যেন বলতে চেয়েছেন, কৃষ্ণ এখনও পুরোনো বৃন্দাবনের ভাবনায় বিভোর, অথচ পৃথিবী অনেক বদলে গেছে। তাই তাঁকে বাস্তবতায় নেমে আসার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
গানটি কৌতুক ও ব্যঙ্গের মাধ্যমে আধুনিকতার প্রভাবে সমাজ, সংস্কৃতি ও প্রকৃতির পরিবর্তিত রূপ তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে এটি পুরোনো ঐতিহ্য ও আধুনিক জীবনের সংঘাতকে হাস্যরসের আবরণে উপস্থাপন করা হয়েছে।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় নি। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৪৫) মাসে এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি থেকে প্রকাশিত হয়েছিল 'কলির কেষ্ট' নামক নাটিকা। এই নাটিকায় গানটি ছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৯ বৎসর ৩ মাস।
- রেকর্ড: কলির কেষ্ট (সংলাপধর্মী গান)। এইচএমভি [সেপ্টেম্বর ১৯৩৮ (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৪৫)। এন ১৭১৯৪। শিল্পী: রঞ্জিত রায়। সুর: নজরুল ইসলাম] [শ্রবণ নমুনা]
- গ্রন্থ:
- কলির কেষ্ট। [নজরুল রচনাবলী অষ্টম খণ্ড। বাংলা একাডেমি, ১২ ভাদ্র ১৪১৫। ২৭ আগষ্ট ২০০৮। পৃষ্ঠা ২৭০।]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ৮২৯।
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার: ইদ্রিস আলী [নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি, চব্বিশতম খণ্ড, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা] ষষ্ঠ গান। [নমুনা]
- সুরকার: নজরুল ইসলাম
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দধর্ম। বৈষ্ণব। কৃষ্ণ। রঙ্গ-ব্যঙ্গ
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্য
- তাল: দ্রুত দাদরা
- গ্রহস্বর: সা