(মাগো) তোর কালো রূপ দেখতে মাগো, কাল হ’ল মোর আঁখি (tor kalo rup dekhte mago, kal holo mor ankhi)
(মাগো) তোর কালো রূপ দেখতে মাগো, কাল হ’ল মোর আঁখি,
চোখের ফাঁকে যাস পালিয়ে মা তুই কালো পাখি॥
আমার নয়ন-দুয়ার বন্ধ ক’রে এই দেহ পিঞ্জরে,
চঞ্চলা গো বুকের মাঝে রাখি তোরে ধ’রে;
চোখ্ চেয়ে তাই খুঁজে বেড়াই পাই না ভুবন ভ’রে
সাধ যায় মা জন্ম জন্ম অন্ধ হ’য়ে থাকি॥
কালো রূপের বিজলি চমক কোটি লোকের জ্যোতি,
অনন্ত তোর কালোতে মা সকল আলোর গতি।
তোর কালো রূপ কে বলে মা ‘তমঃ’,
ঐ রূপে তুই মহাকালি মাগো নমঃ নমঃ
তুই আলোর আড়াল টেনে মাগো দিস্ না মোরে ফাঁকি॥
- ভাবসন্ধান: এই গানটিতে ভক্তের হৃদয়ে মহাশক্তি দেবী কালীর প্রতি গভীর প্রেম, আত্মসমর্পণ এবং তাঁর রহস্যময় কালো রূপের মহিমা উপস্থাপিত হয়েছে। মূলত গানটিতে দেবী কালীর কালো রূপের আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা উপস্থাপিত হয়েছে। এখানে ‘কালো’ অশুভ বা অন্ধকারের প্রতীক নয়; বরং অনন্ত, অসীম, সর্বগ্রাসী এবং সর্বসৃষ্টির উৎসরূপ পরম শক্তির প্রতীক। ভক্ত সেই পরম শক্তির সঙ্গে একাত্ম হওয়ার আকাঙ্ক্ষাই গভীর ভক্তিভাবের সঙ্গে প্রকাশ করেছেন।
ভক্ত মায়ের কালো রূপে এমন মোহাবিষ্ট যে, সেই রূপ দর্শনের আকাঙ্ক্ষায় তাঁর নিজের চোখও যেন ‘কালো’ হয়ে গেছে। মা কালীর চঞ্চলা ও অধরা রূপকে তিনি সহজে ধারণ করতে পারেন না। তাই বারবার তাঁকে খুঁজেও তাঁর পূর্ণরূপ দর্শনে ব্যর্থ হন। মাতৃরূপিণী কালী ভক্তের চোখকে ফাঁকি দিয়ে যেন কালো পাখি হয়ে পালিয়ে যান।
ভক্ত কামনা করেন, যেন তিনি নিজের হৃদয়ের গভীরে মাকে স্থায়ীভাবে ধারণ করতে পারেন। নয়ন দুয়ার বন্ধ করে- অর্থাৎ বাহ্যজগতে তাঁকে খুঁজে বেড়ানোর পরিবর্তে তিনি মাকে নিজের অন্তরে বন্দি করে রাখতে চান। এমনকি জন্ম-জন্মান্তরে অন্ধ হয়ে থাকতেও তাঁর আপত্তি নেই, যদি অন্তরের মধ্যে সর্বদা মায়ের উপস্থিতি অনুভব করতে পারেন। এখানে অন্ধত্ব বাহ্যদৃষ্টির লোপ নয়, বরং জাগতিক দৃশ্য ও মোহ থেকে মুক্ত হয়ে অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে দেবীকে উপলব্ধি করার আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।
কবির কাছে মায়ের কালো রূপ কেবল অন্ধকারের প্রতীক নয়। তিনি মনে করেন মায়ের কালো রূপের ভিতরে নিহিত রয়েছে তাঁর অসীম জ্যোতি ও শক্তি। তাঁর কালো রূপের এক ঝলক বিদ্যুতের মতো কোটি কোটি আলোর উৎসকে ম্লান করে দিতে পারে। অনন্ত মহাকাশের মতো সেই কালো রূপের মধ্যেই সকল আলো, শক্তি ও সৃষ্টির উৎস নিহিত। তাই যাঁরা এই কালো রূপকে নিছক অন্ধকার মনে করেন, তাঁরা এর গভীর তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারেন না। উল্লেখ্য, শাক্ত দর্শনে এর একটি গভীর তাৎপর্য আছে। এখানে "কালো" শুধু আলোকে ম্লান করে না, বরং সকল আলো যে অনন্তের মধ্যে বিলীন হয় এবং যেখান থেকে সকল আলোর উদ্ভব হয়। কালো সেই মহাশক্তির প্রতীক।
গানের শেষে ভক্ত মায়ের কাছে নিবেদন করেন, তিনি যেন আলোর আড়াল টেনে নিজেকে লুকিয়ে না রেখে- ভক্তকে তাঁর সত্যস্বরূপ দর্শন থেকে বঞ্চিত না করেন। ভক্তের একমাত্র আকাঙ্ক্ষা হলো- দেবী মহাকালীর সেই চিরন্তন, রহস্যময় ও পরম রূপের প্রত্যক্ষ উপলব্ধি করা।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি (পৌষ-মাঘ ১৩৪৪) মাসে, এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি গানটির প্রথম রেকর্ড করেছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৮ বৎসর ৭ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, [নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ৮৫৩ গান।
- রেকর্ড: এইচএমভি [জানুয়ারি ১৯৩৮ (পৌষ-মাঘ ১৩৪৪)। এন ১৭০৩১। শিল্পী: মৃণালকান্তি ঘোষ। সুর: নজরুল ইসলাম [শ্রবণ নমুনা]
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার: সালাউদ্দিন আহ্মেদ [নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি, পঁচিশতম খণ্ড, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা। ভাদ্র, ১৪১২/আগস্ট ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দ] ১৭ সংখ্যক গান। [নমুনা]
- সুরকার: নজরুল ইসলাম
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম, শাক্ত। কালী। বন্দনা
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের গান
- তাল: দাদরা
- গ্রহস্বর: র্সা