তোরা যারে এখনি হালিমার কাছে লয়ে ক্ষীর সর ননী (tora jare ekhoni halimar kachhe loye kheer shor noni)
তোরা যারে এখনি হালিমার কাছে লয়ে ক্ষীর সর ননী
আমি খোয়াবে দেখেছি কাঁদিছে মা বলে আমার নয়ন-মণি॥
মোর শিশু আহমদে যেদিন কাঁদিয়া
হালিমার হাতে দিয়াছি সঁপিয়া
সেই দিন হ’তে কেঁদে কেঁদে মোর কাটিছে দিন রজনী॥
পিতৃহীন সে সন্তান হায় বঞ্চিত মা’র স্নেহে
তারে ফেলে দূর কোল খালি করে (আমি) থাকিতে পারি না গেহে।
অভাগিনী তার মা আমিনায়
মনে করে সে কি আজো কাঁদে হায়
বলিস তাহারি আসার আশায় দিবানিশি দিন গণি॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে মা আমিনার মাতৃস্নেহ, সন্তানের প্রতি গভীর মমত্ববোধ এবং বিচ্ছেদজনিত বেদনার করুণ প্রকাশ ঘটেছে। আরবের প্রাচীন প্রথা অনুসারে শিশু মুহাম্মদকে (সা.) লালন-পালনের জন্য ধাত্রীমাতা হালিমার কাছে অর্পণ করা হয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্র করেই কবি মায়ের হৃদয়ের আকুল অনুভূতিকে গীতরূপ দিয়েছেন।
গানের শুরুতে আমিনা উদ্বিগ্ন কণ্ঠে তাঁর সহচরীদের অনুরোধ করেন, তারা যেন দ্রুত হালিমার কাছে গিয়ে তাঁর নয়নের মণি, শিশু আহমদের খোঁজ নিয়ে আসে। তাঁর মনে হয়, প্রিয় সন্তানটি হয়তো 'মা' বলে কাঁদছে এবং তাঁকে খুঁজছে। এই চিন্তা তাঁকে ব্যাকুল করে তোলে।
আমিনা স্মরণ করেন সেই বেদনাময় দিনের কথা, যেদিন তিনি কাঁদতে কাঁদতে শিশু আহমদকে হালিমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। সেই দিন থেকে সন্তানের বিচ্ছেদে তাঁর দিন-রাত অশ্রুসিক্ত হয়ে কাটছে। মাতৃহৃদয় সন্তানের অভাব কোনোভাবেই ভুলতে পারে না; তাই বিচ্ছেদের প্রতিটি মুহূর্ত তাঁর কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
তিনি আরও ভাবেন, পিতৃহীন সন্তানটি মাতৃস্নেহ থেকেও বঞ্চিত হয়েছে। এত ছোট শিশুকে নিজের কোল থেকে দূরে রেখে তাঁর পক্ষে ঘরে শান্তিতে থাকা সম্ভব নয়। সন্তানকে কাছে না পাওয়ার বেদনা তাঁর হৃদয়কে প্রতিনিয়ত বিদীর্ণ করে। গানের শেষাংশে আমিনা নিজেকে অভাগিনী বলে আখ্যায়িত করেন এবং ভাবেন, তাঁর শিশুপুত্র কি আজও তাঁকে স্মরণ করে কাঁদে? এই প্রশ্নের মধ্য দিয়ে মায়ের হৃদয়ের গভীর আকুলতা ও সন্তানের প্রতি অফুরন্ত ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছে। তিনি সন্তানের ফিরে আসার আশায় দিন-রাত গুনতে থাকেন এবং প্রতীক্ষা করেন সেই আনন্দময় মুহূর্তের, যখন আবার তিনি তাঁর আদরের সন্তানকে বুকে জড়িয়ে নিতে পারবেন।
মূলত, এই গানে মা আমিনার মাতৃস্নেহ, সন্তানের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা, বিচ্ছেদের বেদনা এবং পুনর্মিলনের আকাঙ্ক্ষার এক হৃদয়স্পর্শী ও করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে। এটি মাতৃত্বের চিরন্তন অনুভূতির এক অপূর্ব কাব্যিক প্রকাশ।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের আগষ্ট (শ্রাবণ-ভাদ্র ১৩৪৪) মাসে এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৮ বৎসর ২ মাস।
- রেকর্ড: এইচএমভি [আগষ্ট ১৯৩৭ (শ্রাবণ-ভাদ্র ১৩৪৪)। এন ৯৯৩৯। শিল্পী: পরীবাণু। সুর: কমল দাশগুপ্ত]
- গ্রন্থ:
- জুলফিকার। দ্বিতীয় সংস্করণ [ডিসেম্বর, ১৯৫২ (পৌষ ১৩৫৯ বঙ্গাব্দ)]
- নজরুল রচনাবলী সপ্তম খণ্ড [কার্তিক ১৪১৯, নভেম্বর ২০১২। জুলফিকার দ্বিতীয় খণ্ড। ১৪। পৃষ্ঠা ৯৭-৯৮]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ,[নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ৮৬৪।]
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার: আহসান মুর্শেদ [নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি, ছাব্বিশ খণ্ড, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা। আশ্বিন, ১৪১২ বঙ্গাব্দে /সেপ্টেম্বর ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দ] দশম গান। [নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলামী গান। আমিনা। অপত্যস্নেহ
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্য
- তাল: দাদরা
- গ্রহস্বর: গা