ত্রিজগত আলো করে আছে কালো মেয়ের পায়ের শোভা (trijogot alo kore achhe kalo meyer payer shova)
ত্রিজগত আলো করে আছে কালো মেয়ের পায়ের শোভা।
মহাভাবে বিভোর শঙ্কর, ঐ পা জড়িয়ে মনোলোভা॥
দলে দলে গগন বেয়ে গ্রহ তারা এলো ধেয়ে,
ঐ চরণ শোভা দেখবে বলে, ঐ পায়ের নূপুর হওয়ার ছলে
সেই শোভা কেমন বলতে গিয়ে ব্রহ্ম হলো চির মৌনী বোবা॥
ঐ চরণ শোভা দেখার তরে, যোগী থাকেন ধেয়ান ধ'রে
ত্রিভুবন ভুলে অনন্তকাল যোগী থাকেন ধেয়ান ধ'রে।
ও শুধু চরণ শোভা নয়, ঐ যে পরব্রহ্ম জ্যোতি
শ্রী চণ্ডী বেদ পুরানে ওরি প্রেম-আরতি
মা দেখ্তো যদি নিজের চরণ নিজেই দিত বিল্বজবা
আপনার ঐ রাঙা পায়ে নিজেই দিত বিল্বজবা॥
- ভাবসন্ধান: গানটিতে দেবী কালীর চরণমাহাত্ম্য, তাঁর পরমব্রহ্মস্বরূপ এবং ভক্তের গভীর প্রেম, শ্রদ্ধা ও আত্মসমর্পণের ভাব উপস্থাপিত হয়েছে। কবি দেবী কালীকে সর্বোচ্চ পরমসত্তা ও মহাশক্তিরূপে কল্পনা করেছেন।
কবি মনে করেন, মাতৃরূপিণী কালীর চরণযুগলের সৌন্দর্য ও মহিমা এতই অতুলনীয় যে তা সমগ্র ত্রিভুবনকে আলোকিত করে রেখেছে। দেবাদিদেব শঙ্করও সেই চরণে পরম ভক্তিভরে আশ্রয় নিয়ে মহাভাবে বিভোর হয়ে আছেন। দেবীর চরণদর্শনের আকাঙ্ক্ষায় গ্রহ-নক্ষত্র ও তারকারাজিও যেন তাঁর পায়ের নূপুর হওয়ার ছলে ছুটে আসে। সেই অপরূপ শোভা ভাষায় প্রকাশ করতে গিয়ে সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মাও নীরব হয়ে যান; কারণ এই সৌন্দর্য বর্ণনার অতীত। যোগী ও সাধকেরা যুগের পর যুগ ধ্যানমগ্ন হয়ে সেই চরণশোভা দর্শনের সাধনা করেন। তাঁরা সংসার, সময় ও জাগতিক মোহ বিস্মৃত হয়ে অনন্তকাল ধ্যানস্থ থাকেন। তবে এই চরণশোভা কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্যের প্রকাশ নয়; এর মধ্যে পরব্রহ্মের জ্যোতি, চিরন্তন সত্য ও ঈশ্বরীয় মহিমার প্রকাশ ঘটেছে। শ্রী চণ্ডী, বেদ ও পুরাণে দেবীর এই মহিমা এবং তাঁর প্রতি ভক্তদের প্রেমময় আরাধনার কথা বর্ণিত হয়েছে।
শেষাংশে কবি কল্পনা করেন, যদি মা নিজেই নিজের চরণদ্বয় দর্শন করতে পারতেন, তবে সেই অনির্বচনীয় সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে নিজেই নিজের রাঙা চরণে বিল্বপত্র ও জবা ফুল অর্পণ করতেন।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২) -এর ৬৩১ সংখ্যক গান।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে (চৈত্র ১৩৪৬-বৈশাখ ১৩৪৭), এইচএমভি কোম্পানি গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশ করেছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৪০ বৎসর ১০ মাস।
- রেকর্ড:
- এইচএমভি [এপ্রিল ১৯৪০ (চৈত্র ১৩৪৬-বৈশাখ ১৩৪৭)। এন ১৭৪৪৪। শিল্পী: বীণা চৌধুরী। সুর-শৈলেশ দত্তগুপ্ত]
- এইচএমভি [সেপ্টেম্বর ১৯৪৯ (ভাদ্র- আশ্বিন ১৩৫৫)। এন ৩১০৮২। শিল্পী: মৃণালকান্তি ঘোষ। সুর-শৈলেশ দত্তগুপ্ত] [শ্রবণ নমুনা]
বি.দ্র.: দুটি রেকর্ডের সুর ভিন্ন।
- সুরকার: শৈলেশ দত্তগুপ্ত
- স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি:
- নীলিমা দাস। [নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি, বত্রিশতম খণ্ড, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা। ফাল্গুন ১৪১৫। ফেব্রুয়ারি ২০০৯] ২৩ সংখ্যক গান। রেকর্ড বীণা চৌধুরীর গাওয়া গানের সুরানুসারে স্বরলিপি করা হয়েছে। [নমুনা]
- ইদ্রিস আলী। [নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি চুয়াল্লিশততম খণ্ড। নজরুল ইন্সটিটিউট কর্তৃক প্রকাশিত। আষাঢ় ১৪২৪/জুন ২০১৮] পৃষ্ঠা: ৮৫-৯১[নমুনা]
- পর্যায়