নাচিয়া নাচিয়া এসো নন্দদুলাল (nachiya nachiya esho nondodulal)

নাচিয়া নাচিয়া এসো নন্দদুলাল,
মোর প্রাণে মোর মনে, এসো ব্রজগোপাল॥
এসো নূপুর রুনুঝুনু পায়ে, এসো প্রেম যমুনা নাচায়ে
এসো বেণু বাজায়ে, এসো ধেনু চরায়ে এসো কানাই রাখাল॥
ঝুলনে হোরিতে রাসে, এসো কুরুক্ষেত্র রণে এসো প্রভাসে,
(এসো) শিশু রূপে, এসো কিশোর বেশে
এসো কংস, অরি, এসো মৃত্যুকরাল॥

  • ভাবসন্ধান: এই গানে শ্রীকৃষ্ণের বাল্য, কৈশোর, প্রেমলীলা, রাখালজীবন, ধর্মপ্রতিষ্ঠা, অসুরবিনাশ এবং লীলাসমাপ্তি, সমস্ত রূপকে স্মরণ করে কবি তাঁকে নিজের হৃদয়ে চিরস্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত করার আকুল প্রার্থনা করেছেন। গানের মূল ভাব হলো- শ্রীকৃষ্ণ সকল রূপে, সকল লীলায় এবং সকল কালে ভক্তের হৃদয়ে বিরাজমান সর্বমঙ্গলময় পরমেশ্বর। তাই এই ভক্তিমূলক গানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বহুমাত্রিক রূপকে একসূত্রে গেঁথে তাঁর সর্বব্যাপী, সর্বকালীন ও সর্বলীলাময় সত্তার বন্দনা করা হয়েছে। কবির আকাঙ্ক্ষা-শ্রীকৃষ্ণ যেন তাঁর অন্তর, মন ও জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আবির্ভূত হন।

    গানের শুরুতে কবি শ্রীকৃষ্ণকে নন্দদুলাল ও ব্রজগোপাল রূপে আহ্বান করেছেন। তাঁর প্রার্থনা কৃষ্ণ আসুন তাঁর নূপুরের রুনুঝুনু ধ্বনিতে, প্রেমময় যমুনাতীরে বেণু বাজিয়ে, গরু চরানো কানাই রাখাল রূপে আবির্ভূত হয়ে। যেন  তিনি ভক্তের মনকে প্রেম, আনন্দ ও ভক্তিরসে পূর্ণ করে তোলেন। এখানে বৃন্দাবনের মাধুর্যলীলা ও কৃষ্ণের কোমল, স্নেহময় রূপের প্রকাশ ঘটেছে।

    গানের পরবর্তী অংশে কবি কৃষ্ণের জীবনের বিভিন্ন লীলাক্ষেত্র ও রূপকে স্মরণ করেছেন। ঝুলন, হোলি এবং রাসলীলা-য় তিনি প্রেম ও আনন্দের দেবতা; আবার কুরুক্ষেত্রে তিনি ধর্মরক্ষার জন্য উপদেশদাতা ও ন্যায়যুদ্ধের প্রেরণাদাতা। প্রভাসে তাঁর পার্থিব লীলার সমাপ্তির ঘটনাও স্মরণ করা হয়েছে। অর্থাৎ জন্ম থেকে লীলাবিলাস, ধর্মপ্রতিষ্ঠা এবং লীলাসমাপ্তি—কৃষ্ণজীবনের সমগ্র ধারাকেই কবি একটি ধারাবাহিক ঐক্যে দেখেছেন।
    উল্লেখ্য, প্রভাস পাটণ (বর্তমান গুজরাটের সোমনাথ অঞ্চলের নিকটবর্তী) একটি প্রাচীন ও পবিত্র তীর্থক্ষেত্র।  এটি শ্রীকৃষ্ণের জীবনের শেষ লীলাক্ষেত্রকে নির্দেশ করে।

    শেষে কবি শ্রীকৃষ্ণের বিপরীতধর্মী দুই রূপকে একত্রে তুলে ধরেছেন। তিনি যেমন শিশু ও কিশোর রূপে স্নেহ, সৌন্দর্য ও মাধুর্যের প্রতীক, তেমনি কংস-অরি হিসেবে অধর্ম ও অত্যাচারের বিনাশকারী। আবার মৃত্যুকরাল রূপে তিনি অশুভ শক্তির জন্য ভয়ংকর, কিন্তু ধর্মপরায়ণ মানুষের জন্য মুক্তি ও কল্যাণের পথপ্রদর্শক। ফলে কৃষ্ণের কোমলতা ও কঠোরতা, প্রেম ও ন্যায়, লীলা ও কর্তব্য—সবই তাঁর পূর্ণাঙ্গ ঐশ্বরিক সত্তার অংশ।

     
  • রচনাকাল ও স্থান:  গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি  (মাঘ-ফাল্গুন ১৩৩৯) মাসে গানটি প্রথম এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৩ বৎসর ৮ মাস।
     
  • গ্রন্থ:
    • গীতি-শতদল
      • প্রথম সংস্করণ [বৈশাখ ১৩৪১। এপ্রিল ১৯৩৪। পাহাড়ি-সেতারখানি] [গীতি-শতদল-৫৯]
      • নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ, পঞ্চম খণ্ড। বাংলা একাডেমী, ঢাকা। জ্যৈষ্ঠ ১৪১৮ মে, ২০১১। গীতি-শতদল। গান সংখ্যা ৫৯। বেহাগ মিশ্র-কার্ফা। পৃষ্ঠা ৩১৫]
    • নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ৬৯৫]
  • রেকর্ড:  এইচএমভি। [ফেব্রুয়ারি ১৯৩৩ (মাঘ-ফাল্গুন ১৩৩৯)। এন ৭০৮১। শিল্পী: মৃণালকান্তি ঘোষ]  [শ্রবণ নমুনা]
     
  • স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি: সালাউদ্দিন আহ্‌মেদ [নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি, অষ্টাদশ খণ্ড। প্রথম সংস্করণ। নজরুল ইন্সটিটিউট আশ্বিন ১৪০৪/অক্টোবর ১৯৯৩। ১৭ সংখ্যক গান] [নমুনা]
     
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গী। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। কৃষ্ণ। বন্দনা
    • সুরাঙ্গ: ভজন

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।