মধুর আরতি তব বিশ্ব-সভাতে (modhur aroti tobo bissho-sobhate)
মধুর আরতি তব বিশ্ব-সভাতে
নিত্য হেরি নাথ সন্ধ্যায় প্রভাতে॥
চন্দ্র, সূর্য্য, দীপ গগন-থালা
শ্বেত মেঘ-চন্দন, তারার মালা
মলয় সমীর পূজা-ধূপের গন্ধ
ঝরা ফুল-অঞ্জলি ধরণীর হাতে॥
শঙ্খ বাজায় তব সাগর-কল্লোল
বজ্র রবে ঘন ঘণ্টার রোল
বিগ্রহ নিখিল সৃষ্টি-আঙিনায়।
(তব) শান্ত স্তব-গাথা প্রণব-ওঙ্কার
ঝমঝম বৃষ্টিতে ঝাঁঝর ঝঙ্কার।
দেবদাসী সম কোটি গ্রহ ঘুরে ঘুরে
তোমার বন্দনা-নৃত্যে মাতে॥
- ভাবসন্ধান: পরমসত্তা ও বিশ্বপ্রকৃতি বিচ্ছিন্ন নয়। সমগ্র বিশ্বজগতের মধ্যেই তাঁর প্রকাশ এবং সমগ্র প্রকৃতিই তাঁর নিত্য উপাসক। এই ভাবদর্শে রচিত এই গানে কবি উপলব্ধি করেছেন- সন্ধ্যা ও প্রভাতে সমগ্র বিশ্ব যেন পরম সত্তার আরতি করছে। এখানে সন্ধ্যা ও প্রভাত দিবা রাত্রির দুটি সন্ধিক্ষণ নির্দেশিত হলেও- এর দ্বারা সার্বক্ষণিক দশাকে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই আরতি মানুষের তৈরি কোনো ক্ষুদ্র পূজামণ্ডপ নয়, সমগ্র বিশ্বই তাঁর ‘বিশ্ব-সভা’ যে সভায় কবি স্রষ্টাকে প্রতিমুহুর্ত অনুভব করেন।
সে বিশ্বসভার আকাশকে পূজার থালা বা আরতির পাত্র হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। সেই আকাশের মধ্যে চন্দ্র ও সূর্য যেন দুটি প্রদীপ। অর্থাৎ মহাজাগতিক জ্যোতিই পরমসত্তার আরতির আলো। কবি সাদা মেঘ যেন দেবতার কপালে অর্পিত চন্দন, আর অসংখ্য তারা যেন গলায় পরানো মালা হিসেবে গণ্য করেছেন। কবির কল্পনা- সেখানে মৃদু সুগন্ধময় বাতাস যেন পূজার ধূপের সুবাস ছড়াচ্ছে। আর পৃথিবীর বুকে ঝরে-পড়া ফুল যেন ধরিত্রী নিজের হাতে দেবতার চরণে অঞ্জলি দিচ্ছে। অর্থাৎ, বিশ্বজগতের দৃশ্যই শুধু নয়, তার ধ্বনিও পরমসত্তার বন্দনায় পরিণত হয়েছে।
অসংখ্য গ্রহ নিজ নিজ কক্ষপথে ঘুরছে। কবির কল্পনায় তারা যেন মন্দিরের দেবদাসীদের মতো নৃত্যরত, আর সেই নৃত্য কোনো পার্থিব দর্শকের জন্য নয়—তা পরমসত্তার বন্দনা। অর্থাৎ গ্রহের আবর্তনও এক মহাজাগতিক নৃত্য, যার মধ্য দিয়ে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড অনন্ত স্রষ্টার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছে।
কবি মনে করেন- পরমসত্তার বিগ্রহ কোনো একটি মন্দিরে সীমাবদ্ধ নয়— সমগ্র সৃষ্টিই তাঁর বিগ্রহ বা প্রকাশ। অর্থাৎ দৃশ্যমান বিশ্বজগতের মধ্যেই তাঁর উপস্থিতি অনুভূত হয়। প্রণব বা ‘ওঁ’-ধ্বনি এখানে পরম সত্তার মহাজাগতিক স্তবের প্রতীক। আর বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ যেন পূজার ঝাঁঝর বা করতালের ঝঙ্কার।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে জানা যায় না। ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর (অগ্রহায়ণ-পৌষ ১৩৪৪) মাসে, টুইন রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৮ বৎসর ৬ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২)। গান সংখ্যা ৪৬৮]
- রেকর্ড: টুইন রেকর্ড। ডিসেম্বর ১৯৩৭ (অগ্রহায়ণ-পৌষ ১৩৪৪)। এফটি ১২১৯৬। সাধক সংঘ [শ্রবণ নমুনা]
এর জুড়ি গান: অনাদিকাল হতে অনন্তলোক গাহে
- স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি: সুধীন দাশ। [নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি, সপ্তদশ খণ্ড। প্রথম সংস্করণ। নজরুল ইন্সটিটিউট আষাঢ়, ১৪০৩/ জুন, ১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দ। ২১ সংখ্যক গান।] [নমুনা]
- সুরকার: সুবল দাসগুপ্ত
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। সাধারণ। পরমসত্তা
- সুরাঙ্গ: স্বকীয়
- তাল: কাহারবা
- গ্রহস্বর: গা