মরুর ধূলি উঠলো রেঙে রঙিন গোলাপ-রাগে (morur dhuli uthlo renge rongin golap-rage)
মরুর ধূলি উঠলো রেঙে রঙিন গোলাপ-রাগে
বুলবুলিরা উঠলো গেয়ে মক্কার গুল্বাগে॥
খোদার প্রেমের কোন্ দিওয়ানা
দ্বারে দ্বারে দেয় রে হানা,
নবীন আশার আলোক পেয়ে, ঘুমন্ত সব জাগে॥
এ কোন তরুণ প্রেমিক এলো কা'বার অঙ্গনে
সবুজ পাতার নিশান দোলায় শুক্নো খেজুর বনে।
এলো নব দীনের নকীব
চির-চাওয়া খোদার হাবীব
নিখিল পাপী-তাপী যাঁহার পায়ের পরশ মাগে॥
- ভাবসন্ধান: মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আবির্ভাবে মানবসমাজে এক নতুন যুগের সূচনা হয়েছিল। তাঁর আগমনে অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও নৈতিক অবক্ষয়ের পরিবর্তে সত্য, ঈমান, প্রেম, ন্যায় ও আশার আলো প্রতিষ্ঠিত হয়। কবি প্রকৃতির নানা রূপক ও প্রতীকের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক নবজাগরণের সৌন্দর্যকে কাব্যময়ভাবে প্রকাশ করেছেন।
এই গানে কবি রূপক, চিত্রকল্প ও প্রতীকের মাধ্যমে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আবির্ভাব এবং ইসলামের সূচনাকে এক মহাজাগতিক নবজাগরণ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর আগমনে শুধু মানুষ নয়, সমগ্র প্রকৃতিই যেন আনন্দ ও আশার উল্লাসে মুখর হয়ে ওঠে।
গানের শুরুতেই কবি বলেন, মরুভূমির ধূলিকণা যেন গোলাপের রঙে রাঙা হয়ে উঠেছে এবং মক্কার বাগানে বুলবুলিরা গান গাইতে শুরু করেছে। বাস্তবে মরুভূমির ধূলি গোলাপে রূপান্তরিত হয়নি কিংবা বুলবুলিরা নবীর আগমনে গান গায়নি; এগুলো প্রতীকী চিত্র। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, মহানবীর আবির্ভাবে দীর্ঘদিনের নিরানন্দ, অন্ধকার ও নৈতিক শূন্যতার মধ্যে আনন্দ, সৌন্দর্য ও জীবনের সঞ্চার হয়েছিল।
এরপর কবি প্রশ্ন করেন—কে সেই আল্লাহপ্রেমে উন্মত্ত মানুষ, যিনি ঘরে ঘরে গিয়ে মানুষের হৃদয়ে সত্য ও ঈমানের আহ্বান পৌঁছে দিচ্ছেন? এখানে সেই "দিওয়ানা" মহানবী (সা.)-এর প্রতীক। তাঁর আহ্বানে মানুষ নতুন আশার আলো খুঁজে পায় এবং অজ্ঞতা ও গাফিলতির ঘুম থেকে জেগে ওঠে।
গানটির পরবর্তী অংশে কবি মহানবীকে এক তরুণ প্রেমিক হিসেবে কল্পনা করেছেন, যিনি কাবাঘরে আগমন করেছেন। তাঁর আগমনে শুকিয়ে যাওয়া খেজুরবনেও সবুজ পতাকা দোলার মতো প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। এই সবুজ পতাকা নবজীবন, শান্তি, সমৃদ্ধি ও ইসলামের বিজয়ের প্রতীক। অর্থাৎ তাঁর শিক্ষা মৃতপ্রায় সমাজে নতুন প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছিল।
গানের শেষাংশে কবি মহানবীকে নব দীনের নকীব (নতুন ধর্মের ঘোষক) এবং খোদার হাবীব (আল্লাহর প্রিয়তম) বলে অভিহিত করেছেন। তিনি এমন এক পথপ্রদর্শক, যাঁর সান্নিধ্য লাভের জন্য পাপী, দুঃখী ও পথভ্রষ্ট মানুষও ব্যাকুল। তাঁর পদস্পর্শের আকাঙ্ক্ষা আসলে তাঁর আদর্শ, দয়া, ক্ষমা ও হেদায়েত লাভের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। - রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে (আশ্বিন-কার্তিক ১৩৪৬) টুইন রেকর্ড কোম্পানি এই গানের একটি রেকর্ড প্রকাশ করেছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৪০ বৎসর ৪ মাস।
- গ্রন্থ:
- জুলফিকার দ্বিতীয় সংস্করণ [ডিসেম্বর, ১৯৫২ (পৌষ ১৩৫৯ বঙ্গাব্দ)]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ,[নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২। সংখ্যা ২৭১।]
- রেকর্ড: টুইন [অক্টোবর ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দ (আশ্বিন-কার্তিক ১৩৪৬)। এফটি. ১২৫৮০। শিল্পী: আব্দুল লতিফ। ] [শ্রবণ নমুনা]
- স্বারলিপিকার ও স্বরলিপি: সুধীন দাশ। [নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি, ষষ্ঠ খণ্ড (নজরুল ইন্সটিটিউট, ফাল্গুন ১৪০৩। ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭)-এর ২০ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা: ৯৪-৯৬।] [নমুনা]
- পর্যায়
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। নাত-এ-রসুল
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্য
- তাল: কাহারবা
- গ্রহস্বর: রা