তরুণ প্রেমিক! প্রণয়-বেদন জানাও (torun premik! pronoy bedon janao)

তরুণ প্রেমিক প্রণয়-বেদন জানাও জানাও বে-দিল প্রিয়ায়।
ওগো বিজয়ী নিখিল-হৃদয় করো করো জয় মোহন মায়ায়॥
নহে ঐ এক হিয়ার সমান হাজার কাবা হাজার মসজিদ;
কি হবে তোর কাবার খোঁজে, আশয় তোর খোঁজ হৃদয়-ছায়ায়॥
প্রেমের আলেয়া যে দিল রওশন' যেথায় থাকুক সমান তাহার-
খোদার মসজিদ, মূরত্-মন্দির, ঈসাই-দেউল ইহুদ-খানায়॥
অমর তার নাম প্রেমের খাতায় জ্যোতির্লেখায় রবে লেখা,
দোজখের ভয় করে না সে, থাকে না সে স্বরগ-আশায়॥

  • ভাবসন্ধান: সুফিবাদী দর্শনের আলোকে ওমর খৈয়ামের দুটি রুবাই- নিয়ে নজরুল এই গানটি রচনা করেছিলেন। সুফিবাদী গানটিতে অন্যান্য গজলাঙ্গের গানের মতই খোদার প্রেমকে রহস্যময় প্রতীকী শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা হয়েছে।

    কবি গানটির স্থায়ীতে উপস্থাপন করেছেন এমন এক খোদার প্রেমে মগ্ন তরুণ-প্রেমিককে। যিনি তাঁর যৌবনের উদ্দীপনা, নতুনত্ব, উচ্ছ্বাসে উদ্দীপ্ত। তিনি খোদাকে না পাওয়ার বেদনায় কাতর। কবি এই তরুণকে অনুরোধ করেছেন, তিনি খোদার উদ্দেশ্যে নিবেদিত প্রেমকে নিষ্ঠার সাথে নিবেদন করেন। এখনে কবি খোদাকে 'বে-দিল' অর্থাৎ হৃদয়হীন বিশেষণে বিশেষিত করেছেন। কারণ আল্লাহ সাধকের প্রেমের পরীক্ষার জন্য প্রেমিকের সুগভীর প্রেমের আহ্বানকেও উপেক্ষা করেন। তিনি দয়া দেখান না কারণ তিনি চান তরুণ প্রেমিকের পরিশুদ্ধ প্রেম-নিবেদন। কবি এই তরুণ প্রেমিককে 'বিজয়ী নিখিল-হৃদয়' নামে সম্বোধন করেছেন।  কারণ তিনি মনে করেন- যথার্থ প্রেমে বিশ্বের সকল হৃদয়কে জয় করার মহিমা ধারণ করতে পারেন এই তরুণ প্রেমিক। কবি তাঁকে তাঁর এই মোহনীয় ক্ষমতাকে উদ্দীপ্ত করার উৎসাহ দান করেছেন। যেন তাঁর এই প্রেমের মোহন মায়ায় তিনি নিখিল-হৃদয়কে জয় করতে পারেন।

    প্রথম অন্তরাতে কবি তরুণ প্রেমিককে খোদার প্রেমের একটি দিক নির্দেশনা দিয়েছেন সুফি দর্শনের আলোকে। তিনি মনে করেন- যথার্থ প্রেমিকের হৃদয়ের তুল্যমান হাজার কাবা হাজার মসজিদের চেয়েও মহিমাময়। কবি মনে করেন কাবান বা মসজিদের চেয়ে প্রেমে ভরা হৃদয় অনেক বেশি পবিত্র। তিনি মনে করেন সাধকের সাধনা-স্থল কাবা নয়। কারণ খোদা রয়েছে তাঁর অন্তরে। সেটাই সাধনার আদর্শস্থল।

    দ্বিতীয় অন্তরাতে কবি খোদার প্রেমের মহিমাকে আলেয়ার সাথে তুলনা করেছেন। পার্থিব আলেয়া জলাভূমির উপরে জ্বলে ওঠা অগ্নিনৃত্য। প্রাকৃতিক বিধিতে এই আগুন মিথ্যা বা অলৌকিক নয়। তাকে ধরতে যাওয়াটা ভুল। সাধকের সাধনার গভীর স্তরে খোদার মহিমা জ্যোতির্ময়ী রূপে প্রকাশিত হয়। এটি মিথ্যা বা ভুল আলো নয়, বরং প্রকৃত আলো, যা হৃদয়কে রওশন (আলোকিত) করে। প্রেম যখন হৃদয়ে জ্বলে ওঠে, তখন তা আলেয়ার মতো হঠাৎ, উজ্জ্বল এবং মায়াময় আলো ছড়ায়। এই আলো ভুল পথ দেখায় না, বরং সত্যিকারের পথ দেখায়। এটি হৃদয়কে এমনভাবে আলোকিত করে যে, তা সর্বত্র  সমানভাবে মহিমান্বিত রূপে উদ্ভাসিত করে। 
    এই প্রেমের আলো যদি হৃদয়ে থাকে, তাহলে সব ধর্মস্থান (খোদার মসজিদ, সনাতনধর্মীদের মন্দির, ঈসাই দেউল (খ্রিষ্টানদের গির্জা) এবং ইহুদীদের ধর্মস্থান সিনগগ) একাকার হয়ে যায়।

    তৃতীয় অন্তরাতে কবি এই তরুণ-প্রেমিকের প্রেমের মহিমাকে প্রকাশ করেছন গৌরবান্বিত ঐশ্বরিক মহিমার আলোকে। কবি মনে করেন- সেই প্রেমিকের নাম স্রষ্টার প্রেমের খাতায় জ্যোতির্লেখায় (আলোকিত অক্ষরে) চিরকাল লেখা থাকবে। কারণ সে দোজখের ভয় করে না, স্বর্গের আশাও করে না। প্রকৃত প্রেমিক (সুফি-দর্শনে) লোভ-ভয়ের ঊর্ধ্বে। তাঁর আকাঙক্ষাও স্বর্গ-নরকের ঊর্ধ্বে। তাঁর কাছে খোদার প্রেমই সর্বপ্রাপ্তি।

     
  • রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৩৩৭ বঙ্গাব্দের ভাদ্র মাসে প্রকাশিত 'নজরুল গীতিকা' গ্রন্থে গানটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। এই  সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩১ বৎসর ৩ মাস। ওমর খেয়ামের দুটি রুবাই- নিয়ে এই গানটি তৈরি করা হয়েছিল।
     
  • গ্রন্থ:
    • নজরুল-গীতিকা
      • প্রথম সংস্করণ [ভাদ্র ১৩৩৭ বঙ্গাব্দ। ২ সেপ্টেম্বর ১৯৩০। ওমর খৈয়াম-গীতি। ৫। ভৈরবী-কাওয়ালী। পৃষ্ঠা ৫।
      • নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ। তৃতীয় খণ্ড [বাংলা একাডেমী, ঢাকা ফাল্গুন ১৪১৩/মার্চ ২০০৭] নজরুল গীতিকা।  ওমর খৈয়াম-গীতি। ৫। ভৈরবী-কাওয়ালী। পৃষ্ঠা: ১৭৩]
    • নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ৫৯৭।
       
  • রেকর্ড: এইচএমভি। নভেম্বর ১৯৩২ (কার্তিক-অগ্রহায়ণ ১৩৩৯)। নম্বর এন ৭০৫৬। শিল্পী: কাশেম মল্লিক [শ্রবণ নমুনা]
     
  • স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার: আহসান মুর্শেদ [নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি, ত্রিশতম খণ্ড,  নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা।  আষাঢ়, ১৪১৩/জুলাই ২০০৬] কাশেম মল্লিক-এর রেকর্ডে গাওয়া গান অবলম্বনে কৃত স্বরলিপি। ১১ সংখ্যক গান।  [নমুনা]
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলামী গান। সুফি দর্শন। হামদ। প্রেম ও ভক্তি
    • সুরাঙ্গ: গজল
    • রাগ: ভৈরবী
    • তাল: কাহারবা
    • গ্রহস্বর: সা

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।