দিকে দিকে পুন জ্বলিয়া উঠেছে (dike dike puno jwoliya uthechhe)
দিকে দিকে পুন জ্বলিয়া উঠেছে দীন-ই-ইসলামী লাল মশাল।
ওরে বে-খবর, তুইও ওঠ্ জেগে, তুইও তোর প্রাণ-প্রদীপ জ্বাল॥
গাজী মুস্তাফা কামালের সাথে জেগেছে তুর্কী সুর্খ-তাজ,
রেজা পহ্লবী-সাথে জাগিয়াছে বিরান মুলুক ইরানও আজ
গোলামী বিসরি' জেগেছে মিসরী, জগলুল-সাথে প্রাণ-মাতাল॥
ভলি' গ্লানি লাজ জেগেছে হেজাজ নেজদ্ আরবে ইবনে সউদ্
আমানুল্লার পরশে জেগেছে কাবুলে নবীন আল্-মামুদ,
মরা মরক্কো বাঁচাইয়া আজি বন্দী করিম রীফ্-কামাল॥
জাগে ফয়সল্ ইরাক আজমে, জাগে নব হারুন-আল্-রশীদ,
জাগে বয়তুল মোকাদ্দস্ রে; জাগে শাম দেখ্ টুটিয়া নিদ
জাগে না কো শুধু হিন্দের দশ কোটি মুসলিম বে-খেয়াল॥
মোরা আস্হাব কাহাফের মত হাজারো বছর শুধু ঘুমাই,
আমাদেরি কেহ ছিল বাদশাহ্ কোন কালে; তার করি বড়াই,
জাগি যদি মোরা, দুনিয়া আবার কাঁপিবে চরণে টাল্মাটাল॥
- ভাবসন্ধান: এই গানটিতে কবি মুসলিম বিশ্বের নবজাগরণ এবং তৎকালীন ভারতীয় মুসলমানদের আত্মবিস্মৃত ও নিদ্রিত অবস্থার মধ্যে এক তীব্র বৈপরীত্য তুলে ধরেছেন। বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম জাতি স্বাধীনতা, আত্মমর্যাদা ও জাতীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে জেগে উঠলেও ভারতবর্ষের মুসলমানরা তখনও অতীতের গৌরবস্মৃতিতে বিভোর হয়ে কর্মবিমুখ জীবনযাপন করছে।
গানের সূচনায় কবি ইসলামের নবজাগরণের প্রতীক হিসেবে 'দীন-ই-ইসলামী লাল মশাল'-এর উল্লেখ করেছেন। তুরস্কে মুস্তাফা কামাল, ইরানে রেজা পাহলভী, মিসরে জগলুল পাশা, আরবে ইবনে সউদ, আফগানিস্তানে আমানুল্লাহ, মরক্কোতে আবদুল করিম এবং ইরাকে ফয়সলের নেতৃত্বে মুসলিম জাতি পরাধীনতা ও পশ্চাৎপদতা অতিক্রম করে আত্মপ্রতিষ্ঠার পথে অগ্রসর হয়েছে। এমনকি বয়তুল মোকাদ্দস ও শাম অঞ্চলেও নবজাগরণের সাড়া জেগেছে।
এই বিশ্বব্যাপী জাগরণের মধ্যেও ভারতবর্ষের কোটি কোটি মুসলমান যেন আসহাবে কাহাফের ন্যায় দীর্ঘ নিদ্রায় আচ্ছন্ন। তারা শুধু অতীতের বাদশাহী গৌরব নিয়ে গর্ব করে, কিন্তু বর্তমানের কর্তব্য ও সংগ্রামের প্রতি উদাসীন। কবি এই মানসিকতার কঠোর সমালোচনা করে মুসলমানদের ঐক্য, আত্মশক্তি, কর্মোদ্যম ও জাতীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বিশ্বাস, মুসলমানরা যদি সত্যিই জেগে ওঠে, তবে তারা আবার বিশ্বসভায় সম্মান ও মর্যাদার আসন অধিকার করতে সক্ষম হবে।
টীকা:- গাজী মুস্তাফা কামাল। আধুনিক তুরস্কের প্রতিষ্ঠাতা মুস্তাফা কামাল আতাতুর্ক। ইতিহাসে কামাল পাশা নামে খ্যাত। তিনি ছিলেন তুর্কি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রধান নেতা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যখন অটোমান সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে এবং বিদেশি শক্তিগুলো তুরস্ককে বিভক্ত করার চেষ্টা করে, তখন মুস্তাফা কামাল তুর্কি স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব দেন। তাঁর নেতৃত্বে তুরস্ক স্বাধীনতা রক্ষা করতে সক্ষম হয় এবং ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে আধুনিক তুরস্ক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
- রেজা পহ্লবী। রেজা শাহ পাহলভী নামে খ্যাত। ইরানের পাহলভী রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা এবং ১৯২৫ থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত ইরানের শাহ (সম্রাট)। তাঁর নেতৃত্বে ইরানে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, শিক্ষা সংস্কার, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, সামরিক শক্তিবৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক পুনর্গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।
- জগলুল: সাদ জাগলুল নামে খ্যাত। আরবি উচ্চারণে সা'দ জাগলুল, বাংলায় অনেক সময় জগলুল পাশা বলা হয়। তিনি ছিলেন মিশরের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে মিশরের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দেন এবং মিশরের জনগণকে স্বাধীনতার দাবিতে ঐক্যবদ্ধ করেন। তাঁর নেতৃত্বে ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে মিশরীয় বিপ্লব সংঘটিত হয়, যা মিশরের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
- হেজাজ নেজদ্ আরবে ইবনে সউদ্: পংক্তিটির অর্থ বুঝতে হলে এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট জানা দরকার। আরব উপদ্বীপের পশ্চিমাঞ্চলের নাম হেজাজ। এখনে মক্কা এবং মদিনা অবস্থিত। আর নেফাজ এই উপদ্বীপের মধ্যাঞ্চল। আবদুল আজিজ ইবনে সউদ, বিভিন্ন আরব অঞ্চলকে একত্রিত করে আধুনিক সৌদি আরব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। এই বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে হেজাজ ও নেজদ ছিল অন্যতম।
- আমানুল্লাহ: পুরো নাম আমানুল্লাহ খান। ১৯১৯ থেকে ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত আফগানিস্তানের রাজা ছিলেন। তাঁর শাসনামল আফগানিস্তানের ইতিহাসে নবজাগরণ ও সংস্কারের যুগ হিসেবে পরিচিত। তিনি ব্রিটিশ প্রভাবমুক্ত স্বাধীন আফগানিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেন এবং তৃতীয় অ্যাংলো-আফগান যুদ্ধ-এর পর আফগানিস্তানের পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
- করিম রীফ্-কামা: পুরো নাম- আব্দুল করিম আল-খত্তাবি। এখানে রীফ্ বলতে বোঝানো হয়েছে মরক্কোর উত্তরাঞ্চলের রিফ পর্বতমালা ও অঞ্চলকে, করিম এখানে আব্দুল করিম আল-খত্তাবির নামের অংশ। তিনি ছিলেন মরক্কোর রিফ অঞ্চলের বিখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতা। ১৯২০-এর দশকে তিনি স্পেন ও ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে রিফ যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন এবং রিফ প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন।
- ফয়সল্: ফয়সল বলতে বোঝানো হয়েছে ফয়সল প্রথম-কে। তিনি ছিলেন আধুনিক ইরাক রাষ্ট্রের প্রথম রাজা (১৯২১-১৯৩৩)। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অটোমান সাম্রাজ্য ভেঙে গেলে ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের অধীনে ইরাক গঠিত হয়। এই সময় আরব জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সমর্থনে ফয়সলকে ইরাকের রাজা করা হয়।
- নব হারুন-আল্-রশীদ: বলতে আক্ষরিক কোনো ব্যক্তি বোঝানো হয়নি; এটি একটি রূপক। এখানে ইঙ্গিত করা হয়েছে হারুন আল-রশীদ-কে, যিনি আব্বাসীয় খিলাফতের স্বর্ণযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক ছিলেন। তাঁর শাসনামলকে ইসলামী ইতিহাসে জ্ঞান, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক শক্তির এক গৌরবময় যুগ হিসেবে ধরা হয়। ইরাকের নবজাগরণ এমন শক্তিশালী ও গৌরবময় যে, মনে হচ্ছে হারুন আল-রশীদের যুগ আবার নতুনভাবে ফিরে এসেছে। অর্থাৎ এটি কোনো নতুন খলিফা নয়, বরং ইরাকের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণকে ইসলামের স্বর্ণযুগের সাথে তুলনা করা একটি কাব্যিক রূপক।
- বয়তুল মোকাদ্দস্ (বাইতুল মুকাদ্দাস): আল-আকসা মসজিদ-কেন্দ্রিক পবিত্র নগরী জেরুজালেম-কে বাইতুল মুকাদ্দাস নামে অভিহিত হয়। অনেক সময় সমগ্র ফিলিস্তিনকেও এর দ্বারা ইঙ্গিত করা হয়।
- শাম: ঐতিহাসিক সিরিয়া অঞ্চল বিলাদুশ-শাম। এর অন্তর্ভুক্ত ছিল বর্তমান সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান এবং ফিলিস্তিনের কিছু অংশ।
- আস্হাব কাহাফ: কুরাআনের সুরা কাহফ-এর মতে গুহাবাসী কিছু ঈমানদার যুবক। যাঁরা এক অত্যাচারী শাসকের ধর্মীয় নিপীড়ন থেকে বাঁচতে একটি গুহায় আশ্রয় নেন। আল্লাহ তাঁদেরকে অলৌকিকভাবে দীর্ঘকাল—প্রায় ৩০৯ বছর—নিদ্রিত অবস্থায় রাখেন, পরে আবার জাগ্রত করেন।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ অক্টোবর (শনিবার ২৯ আশ্বিন ১৩৩৯), 'জুলফিকার' নামক গীতি-গ্রন্থে গানটি প্রথম অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৩ বৎসর ৪ মাস।
- গ্রন্থ:
- জুলফিকার
- প্রথম সংস্করণ। ১৫ অক্টোবর ১৯৩২ (শনিবার ২৯ আশ্বিন ১৩৩৯)। ১ সংখ্যক গান। মার্চের সুর
- নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ। চতুর্থ খণ্ড। বাংলা একাডেমী, ঢাকা। জ্যৈষ্ঠ ১৪১৪, মে ২০০৭, জুলফিকার। ১ সংখ্যক গান। মার্চের সুর। পৃষ্ঠা: ২৮৯-২৯০।
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ৩১৪।
- জুলফিকার
- রেকর্ড: এইচএমভি। ডিসেম্বর ১৯৩২ (অগ্রহায়ণ-পৌষ ১৩৩৯)। এন ৭০৬৮। শিল্পী: আব্বাসউদ্দীন আহমদ। [শ্রবণ নমুনা]
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার: সুধীন দাশ ও ব্রহ্মমোহন ঠাকুর। [নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি, একাদশ খণ্ড (নজরুল ইনস্টিটিউট জুন ১৯৯৭)] ১২ সংখ্যক গান [নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: র্মীয়সঙ্গীত। ইসলাম। উদ্দীপনা
- সুরাঙ্গ: মার্চের সুর
- তাল: দাদরা
- গ্রহস্বর: মা